মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আসন্ন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আগামী শুক্রবার যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত, যা পুরো প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আল–জাজিরা ও লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার (ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি) তথ্য অনুযায়ী, বুধবারও দক্ষিণ লেবাননের একাধিক এলাকায় ড্রোন ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
দক্ষিণ লেবাননে একের পর এক হামলা
লেবাননের রাষ্ট্রীয় ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় টায়ার শহরে ইসরায়েলি ড্রোন অন্তত তিনটি পৃথক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এছাড়া নাবাতিহ অঞ্চলের বিনত জাবিল জেলায়ও আরেকটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। একই সময় দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় গোলাবর্ষণ ও নজরদারি অভিযান চালায় ইসরায়েলি সেনারা।
বুধবার সকালের দিকে আল–জাজিরার আরবি প্রতিনিধি দল জানায়, নাবাতিহ জেলার কাফার তিবনিত এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি আল–ফাওকা শহরে অভিযান এবং আলী আল–তাহের পাহাড় ও শহরের আশপাশে গোলাবর্ষণ অব্যাহত ছিল।
পাল্টা প্রতিরোধে হিজবুল্লাহ
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা কাফার তিবনিত এলাকায় অন্তত ১০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে।
এর আগে মঙ্গলবার একই অঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় যানবাহন লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়, যাতে অন্তত চারজন নিহত হন বলে দাবি করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এই পাল্টাপাল্টি হামলা দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
চুক্তির প্রেক্ষাপটে বাড়ছে উদ্বেগ
আগামী শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। তবে এই চুক্তির আগে লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে এর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেহরান আগেই সতর্ক করেছে যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে কিংবা কোনো ধরনের ভূমি দখল চললে তা চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি ও সামরিক কৌশল
আল–জাজিরার বৈরুত প্রতিনিধি জিনা খোদর জানান, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তির ঘোষণা আসার পর সংঘর্ষের তীব্রতা কিছুটা কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তিনি বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নাবাতিহ অঞ্চলের কৌশলগত উচ্চভূমি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে নিরাপত্তা সূত্রগুলো ধারণা করছে।
তিনি আরও জানান, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে কিছু পরিবার ফিরে যেতে শুরু করলেও স্থানীয় জনগণের মধ্যে এখনো গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধবিরতি হলেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বাস্তবতা বনাম আস্থাহীনতা
লেবাননের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা কমলেও আস্থার সংকট কাটেনি। ইসরায়েলের প্রতি যুদ্ধবিরতি মানার আস্থা এখনো তৈরি হয়নি বলে তারা মনে করেন।
এই কারণে সীমান্ত অঞ্চলে মানবিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান, সীমান্ত সংঘর্ষের মাত্রা কিছুটা কমেছে, তবে তা স্থায়ী শান্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার সীমান্তে মোট ১৭৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল ৭০৫টি।
এই ১৭৪টি ঘটনার মধ্যে ১৬৯টি ইসরায়েলি বাহিনীর এবং ৫টি হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে সংঘটিত হয়েছে বলে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
লেবাননে চলমান হামলা ও পাল্টা প্রতিরোধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। একদিকে কূটনৈতিক অগ্রগতি, অন্যদিকে সীমান্তে অব্যাহত সংঘাত—এই দুই বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি লেবাননে উত্তেজনা দ্রুত কমানো না যায়, তাহলে আসন্ন চুক্তির বাস্তবায়নও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।