ঢাকা

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তাজুল ইসলামের প্রশ্ন: জুলাই গণহত্যা কেন পিছিয়ে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতির অভিযোগ তুলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কেন প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।

শুক্রবার (২০ জুন) রাজধানীর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন। ‘জুলাই থ্রু দ্য লেন্স অব লিটারেচার’ শীর্ষক এই কর্মশালার আয়োজন করে ‘রেভোল্যুশন’স ওয়াচ’ নামের একটি সংগঠন।

‘চার মাসে কোনো তদন্ত রিপোর্ট হয়নি’

তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় “ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি” হলেও এর বিচার প্রক্রিয়ায় গতি অত্যন্ত কম।

তিনি বলেন, “এই গণহত্যার বিচার কেন স্লো হয়ে গেল? গত চার মাসে একটি তদন্ত রিপোর্টও দাখিল হয়নি, নতুন কোনো মামলা বা বিচারও শুরু হয়নি—কেন?”

তার মতে, বিচার প্রক্রিয়ার এই স্থবিরতা ভবিষ্যতে ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা সংকট তৈরি করতে পারে।

বিচার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালের পটভূমি

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব দেওয়া হয় মুহাম্মদ তাজুল ইসলামকে।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলায় একসময় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করা তাজুল ইসলাম পরে এই ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পান।

ট্রাইব্যুনালে ইতোমধ্যে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁকে চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আমিনুল ইসলাম।

বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ

কর্মশালায় তাজুল ইসলাম বলেন, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি, নইলে দায়ীরা আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

তিনি বলেন, “আমরা কি এদের বিচারগুলো করতে চাই না? প্রত্যেকটা বিচার সম্পন্ন করতে হবে। না হলে যারা রাস্তায় আস্ফালন করছে, তারা আবারও ফিরে আসার সাহস পাবে।”

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়টি সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে পড়া উচিত এবং এ বিষয়ে গবেষণা ও বই রচনার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

জুলাই আন্দোলন ও স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে মন্তব্য

তাজুল ইসলাম জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের বিচার ও দলিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

তিনি জুলাই জাদুঘর এখনও সবার জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিফলন নিয়ে আলোচনা

কর্মশালায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসকে সাংস্কৃতিকভাবে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য ও চলচ্চিত্র নির্মাণ ভবিষ্যতে আরও হবে, কারণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে গভীরভাবে ধারণ করতে সময় লাগে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে প্রথমে সাহিত্য রচনা জরুরি, যাতে পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব হয়।

চিত্রনাট্যকার মাবরুর রশীদ বান্নাহ বলেন, ডকুমেন্টারি ও অন্যান্য উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল।

‘অসমাপ্ত বিপ্লব’ প্রসঙ্গ

লেখক ও গবেষক প্রিন্স মুহাম্মাদ সজল বলেন, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূর্ণ হয়নি।

তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় আন্দোলনের অর্জন সীমিত হয়ে গেছে এবং “অসমাপ্ত বিপ্লব” সম্পন্ন করতে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।

কবি হাসান রোবায়েত-সহ আরও অনেকে কর্মশালায় বক্তব্য দেন।

সমাপনী প্রেক্ষাপট

কর্মশালায় বক্তারা একমত হন যে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাস, বিচার প্রক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক দলিলীকরণ—সবকিছুই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স