ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমনই দাবি উঠে এসেছে নতুন একটি বইয়ে। বই অনুযায়ী, ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “আমরা এটা করব না”—যা তিনি ডানপন্থী প্রভাবশালী ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসন এবং টেসলা–স্পেসএক্স প্রধান ইলন মাস্কের সঙ্গে আলোচনায় ব্যক্ত করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিগত অবস্থান ঘিরে এই নতুন তথ্য মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকে নতুন করে সামনে এনেছে।
বইটি কী বলছে: ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর দাবি
‘রেজিম চেঞ্জ’ নামের বইটি লিখেছেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান এবং জোনাথন সোয়ান। বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই এর কিছু অংশ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে।
বইটিতে বলা হয়েছে, ওভাল অফিসে একাধিক আলোচনায় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে কার্লসনের সঙ্গে আলোচনায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের যুদ্ধের পথে যাবে না।
কার্লসনের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পের অবস্থান
ডানপন্থী হলেও ইরান ইস্যুতে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেওয়া টাকার কার্লসন ট্রাম্পকে সতর্ক করেন বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে।
কার্লসন ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন,
“ওরা চায় আপনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ান।”
এর জবাবে ট্রাম্প নাকি বলেন,
“আমরা এটা করব না।”
বই অনুযায়ী, কার্লসন ইসরায়েল–ইরান উত্তেজনা ও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করেন এবং বলেন, বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তা রাজনৈতিকভাবে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
ইলন মাস্কের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ
বইটিতে আরও দাবি করা হয়েছে যে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের সঙ্গেও ট্রাম্প বৈশ্বিক সংঘাত ও প্রযুক্তি–নির্ভর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে ওই আলোচনার বিস্তারিত অংশ তুলনামূলকভাবে কম প্রকাশ করা হয়েছে।
লেখকদের মতে, মাস্ক ও কার্লসনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ তার নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক ও জনমত–সংক্রান্ত প্রভাব বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।
ডানপন্থী শিবিরে বিভাজন
বইটিতে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে এবং তার ঘনিষ্ঠ ডানপন্থী সমর্থক মহলে ইরান নীতি নিয়ে মতবিরোধ ছিল।
একদিকে কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষের একটি অংশ ছিল, অন্যদিকে কার্লসনের মতো প্রভাবশালী কণ্ঠগুলো সরাসরি যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজন ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থানকে আরও জটিল করে তোলে।
গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ
বই অনুযায়ী, কার্লসন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা করেন। তিনি সতর্ক করেন যে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
লেখকদের দাবি, এই বিষয়গুলোই ট্রাম্পকে ইরান ইস্যুতে তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিতে প্রভাবিত করেছে।
বইয়ের অন্যান্য বিস্ফোরক দাবি
‘রেজিম চেঞ্জ’ বইটিতে শুধু ইরান ইস্যুই নয়, আরও বেশ কিছু আলোচিত বিষয় উঠে এসেছে—
জেফরি এপস্টেইন কেলেঙ্কারি নিয়ে সিচুয়েশন রুমের আলোচনা
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া
মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে হোয়াইট হাউসের টানাপোড়েন
বইটি আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষণ: যুদ্ধ ও রাজনীতির সীমারেখা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বইটির দাবি যদি সঠিক হয়, তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প প্রশাসনে ইরান ইস্যুতে একদিকে সামরিক চাপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা চলছিল।
কার্লসনের মতো মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের প্রভাব এবং ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি–শিল্প নেতাদের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলেও তারা মনে করেন।
নতুন বইটির তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের পথে না যাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়। তবে এই অবস্থান গড়ে ওঠার পেছনে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং প্রভাবশালী শিল্পপতিদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
সব মিলিয়ে, এই প্রকাশনা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা প্রকাশের পর আরও তীব্র হতে পারে।