ঢাকা

বিজেপির ‘পরবর্তী চাল’ কোন দলকে ঘিরে—তৃণমূল-শিবসেনার পর জল্পনা তুঙ্গে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) লোকসভায় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যে বিরোধী শিবিরে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ভাঙন ও পুনর্গঠনের কৌশল অব্যাহত রেখেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠীতে ভাঙনের পর এবার সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও ডিএমকে–কে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জনকে সামনে রেখে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সংসদের কাঠামো সম্প্রসারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের কৌশলগত পরিকল্পনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তৃণমূল ও শিবসেনা ভাঙনের পর নতুন লক্ষ্য

লোকসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস এবং মহারাষ্ট্রের শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী) থেকে একাধিক সংসদ সদস্যকে এনডিএ–ঘনিষ্ঠ শিবিরে নিয়ে আসার পর বিজেপির রাজনৈতিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ২৯। এর মধ্যে একাধিক সংসদ সদস্যকে ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে বিজেপি সমর্থন কাঠামো বাড়িয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি। একইভাবে শিবসেনার ৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৬ জনকে শিন্ডে–ঘনিষ্ঠ শিবিরে টেনে নেওয়ার মাধ্যমে এনডিএ জোট শক্তিশালী হয়েছে।

এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিজেপির লক্ষ্য এখন আরও বড় আকারে বিরোধী শিবির পুনর্গঠন ও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বৃদ্ধি।

বিরোধী শিবিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বিজেপির পরবর্তী লক্ষ্য উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে।

এসপির লোকসভায় আসন সংখ্যা ৩৭। দুই–তৃতীয়াংশ ভাঙন ঘটাতে হলে অন্তত ২৬ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, যা অর্জন করা কঠিন হলেও রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে, ডিএমকে লোকসভায় ২২টি আসন নিয়ে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান করছে। রাজনৈতিক সমীকরণে এই দুই দলকে ঘিরে ভবিষ্যৎ জোট রাজনীতির দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সংবিধান সংশোধন ও বড় বিল পাসের লক্ষ্য

বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার নারী সংরক্ষণ বিল এবং ‘এক দেশ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। এই দুটি বিল পাসের জন্য সংসদের দুই কক্ষে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অপরিহার্য।

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা আরও সুসংহত করার কৌশলও এই পরিকল্পনার অংশ।

বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, রাজনৈতিক ভাঙন ও দলত্যাগের পেছনে প্রশাসনিক চাপ, তদন্ত সংস্থার ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে।

বিরোধীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ভয় এবং রাজনৈতিক সুবিধার আশ্বাস—এই দুইয়ের সমন্বয়ে দলত্যাগের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। বিজেপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

রাজ্যসভায় তুলনামূলক শক্ত অবস্থান

রাজ্যসভার বর্তমান রাজনৈতিক চিত্র লোকসভার তুলনায় বিজেপির জন্য অপেক্ষাকৃত অনুকূল বলে মনে করা হচ্ছে। বিভিন্ন দল থেকে সদস্যদের যুক্ত হওয়া এবং আসন পরিবর্তনের ফলে উচ্চকক্ষে এনডিএ–র অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের দিকে এগোলে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া সহজ হবে, যা বিজেপির বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ডিএমকে ও স্ট্যালিন ফ্যাক্টর

ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিন দক্ষিণ ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থ ও ফেডারেল কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে আসন পুনর্বিন্যাস ও নারী সংরক্ষণ বিলের প্রস্তাব নিয়ে তার অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও আসন বণ্টনের প্রশ্নে স্ট্যালিনের অবস্থান ভবিষ্যৎ জোট রাজনীতির গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

লোকসভায় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সহজ নয় বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। যদিও বিজেপির কৌশলগত উদ্যোগ, জোট সম্প্রসারণ এবং দলীয় ভাঙন রাজনীতিকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সমাজবাদী পার্টি ও ডিএমকে–র ভূমিকা, এবং বিরোধী জোটের ঐক্য বজায় থাকার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স