ঢাকা

মেয়াদ শেষের আগেই নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ, ইসলামী আন্দোলনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগেই সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা, সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং সামনে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তুতি চলছে।

দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠিতব্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম মজলিশে শুরার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। বৈঠকে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন, পাশাপাশি মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও নির্বাচন-পরবর্তী মূল্যায়নে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে দলটি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দ্রুত নতুন নেতৃত্বকে মাঠে সক্রিয় করতে চায় ইসলামী আন্দোলন।

মজলিশে শুরার বৈঠকে আসতে পারে সিদ্ধান্ত

দলীয় সূত্র জানায়, শনিবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি হোটেলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মজলিশে শুরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকেই কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রেসিডিয়াম, উপদেষ্টা পরিষদ ও মজলিশে আমেলা পুনর্গঠন করা হয়েছিল। সে হিসাবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ডিসেম্বর মাসে।

তবে দলের গঠনতন্ত্রের ১১ ধারা অনুযায়ী, প্রয়োজন মনে করলে নির্ধারিত সময়ের আগেই আমির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনায় দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, ছয় মাস অপেক্ষা করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে দেরি হয়ে যাবে। তাই মজলিশে শুরার বৈঠকে কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়টি আলোচনায় আসবে। সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে দলের আমির এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

মহাসচিব পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা

দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমান মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদের জায়গায় নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে।

ইউনুছ আহমাদ ২০০৮ সাল থেকে টানা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে থাকার পর এবার নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নতুন মহাসচিব হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের নাম। তবে যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্য থেকে অন্য কাউকেও এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমান মহাসচিব ইউনুছ আহমাদকে দলের উপদেষ্টা পরিষদ বা প্রেসিডিয়ামে নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এ ছাড়া প্রেসিডিয়াম, উপদেষ্টা পরিষদ এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক পদে নতুন মুখ যুক্ত হতে পারে। অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় নেতাদের সামনে আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

নির্বাচনী ফলাফল থেকে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে এককভাবে অংশ নেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। নির্বাচনে দলটি মোট ভোটের প্রায় ২ দশমিক ৭০ শতাংশ পায় এবং একটি আসনে জয় লাভ করে।

দলীয় মূল্যায়নে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা, প্রার্থী নির্বাচন, মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়গুলো উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।

তবে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে প্রায় ২২ লাখ ভোট পাওয়া এবং প্রায় ৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থনকে ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে দলটি।

নির্বাচন পরবর্তী মূল্যায়নের ভিত্তিতে ইসলামী আন্দোলন এখন সংগঠন বিস্তারের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ, নারী ও পেশাজীবীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে ছাত্র ও যুবসংগঠনের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা এবং নেতাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে দক্ষ করে তোলার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।

চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী থেকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের লক্ষ্য

দলীয় নেতারা বলছেন, এই পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়; বরং ইসলামী আন্দোলনকে আরও কার্যকর নির্বাচনী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।

দলটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মভিত্তিক সামাজিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। এখন তারা মাঠপর্যায়ে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, দলের লক্ষ্য নির্বাচনী রাজনীতিতে ভালো করা।

তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে একটি চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী থেকে সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে দলকে নির্বাচনী রাজনীতির জন্য আরও উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন নেতৃত্ব

দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় ইসলামী আন্দোলন। নতুন নেতৃত্বকে মাঠে সক্রিয় করে নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার উদ্যোগের পেছনে মূল কারণ হিসেবে নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক গতি বাড়ানোর বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নতুন কমিটিতে অভিজ্ঞদের পাশাপাশি তরুণ ও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় নেতাদের সমন্বয় ঘটিয়ে দলকে আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স