নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের উদ্ভাবনী ভাবনা খুঁজে বের করতে আয়োজিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘আইডিয়া কনটেস্ট ২০২৬’-এর চূড়ান্ত পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দল ‘টিম রোদ্দুর’।
প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বাস্থ্যশক্তি’ এবং দ্বিতীয় রানারআপ হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ‘সোলারক্লাস্টার’ দল।
সাভারে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানে নতুন ও কার্যকর ধারণা আহ্বান করা হয়। ২৫ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত পর্বে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত দলগুলো তাদের উদ্ভাবনী প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে।
তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারে নীতিগত স্বচ্ছতা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে টিআইবি এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
‘প্রোমোটিং গুড গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইন্টেগ্রিটি ইন দ্য এনার্জি সেক্টর ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল, দেশের জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে সামনে নিয়ে আসা।
আয়োজকেরা জানান, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গঠিত দল থেকে প্রতিযোগিতায় তিন শতাধিক ধারণা জমা পড়ে। প্রাথমিক বাছাইয়ে ৩০টি দল নির্বাচিত হয়। পরে চূড়ান্ত পর্বের জন্য বাছাই করা হয় ১০টি দলকে।
‘রোদ্দুর এআই’ দিয়ে সৌরশক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই
চ্যাম্পিয়ন দল বুয়েটের ‘টিম রোদ্দুর’-এর সদস্য মো. মিরাজ হোসেন মাহিন ও মেহেরাব হোসেন অপি তাদের উদ্ভাবন ‘রোদ্দুর এআই’ উপস্থাপন করেন।
তাদের এই প্রযুক্তিভিত্তিক ধারণার মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্থানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাব্যতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিনা মূল্যে যাচাই করা যাবে। কোনো এলাকায় সৌরশক্তি প্রকল্প স্থাপন কতটা কার্যকর হবে, তা দ্রুত নির্ণয়ে এই প্রযুক্তি সহায়ক হবে বলে ধারণা দেন তারা।
স্বাস্থ্যসেবায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার
প্রথম রানারআপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বাস্থ্যশক্তি’ দল বন্যাপ্রবণ গ্রামাঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে হাইব্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরে।
দলের সদস্য তানজীম মালিয়াত ও আসফিন জান্নাত শামসী দেখান, সৌরশক্তিসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহার করে দুর্গম এলাকার স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
উপকূলীয় এলাকায় সোলার মিনি-গ্রিডের ধারণা
দ্বিতীয় রানারআপ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সোলারক্লাস্টার’ দল উপস্থাপন করে উপকূলীয় অঞ্চলে কমিউনিটি মালিকানাধীন সোলার মিনি-গ্রিড স্থাপনের মডেল।
দলের সদস্য মো. নাসিমুজ্জামান সাব্বির সাতক্ষীরার উপকূলীয় চিংড়ি চাষ ক্লাস্টারগুলোতে পরিষ্কার ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এই ধারণা উপস্থাপন করেন। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য।
পুরস্কার পেল বিজয়ীরা
প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন দলকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রথম রানারআপ দলকে ১ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় রানারআপ দলকে ৭৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিজয়ী দলগুলোর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে আসা ১০টি দলই নয়, নতুন ধারণা নিয়ে অংশ নেওয়া সবাই এই উদ্যোগের বিজয়ী। দেশের প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনে তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জন এবং শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তাই বড় শক্তি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা
সমাপনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশের পরিচালক (প্রোগ্রাম) মুনিরউদ্দিন শামীম, বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরীন আহমেদ মাহবুব, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সদস্য ও যুগ্ম সচিব রতন কুমার ঘোষ এবং সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মেহেদী হাসান শামীম, টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এবং এনার্জি গভর্ন্যান্স বিভাগের সমন্বয়ক নেওয়াজুল মওলা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
টিআইবির এই আয়োজনের মাধ্যমে দেশের তরুণ গবেষক ও উদ্ভাবকদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।