ঢাকা

কিম জং–উনের পারিবারিক জীবনের অজানা অধ্যায়, মাকে নিয়ে কেন নীরব তিনি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বিবিসি

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই রহস্যে ঘেরা। তাঁর শৈশব, পরিবার, এমনকি জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিয়েও নানা গোপনীয়তা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হলো তাঁর মা কো ইয়ং–হুইকে ঘিরে।

ক্ষমতায় আসার পর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কিম জং–উন কখনো প্রকাশ্যে নিজের মায়ের নাম উচ্চারণ করেননি। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রচারেও তাঁর মায়ের পরিচয় খুব সীমিতভাবে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—কিম পরিবারের বংশগত বৈধতার রাজনীতি।

‘মাউন্ট পেকতু’ বংশধারার গুরুত্ব

কিম জং–উনের শাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো তথাকথিত ‘মাউন্ট পেকতু’ বংশধারা। উত্তর কোরিয়ার সরকারি প্রচারে এই বংশধারাকে প্রায় পবিত্র মর্যাদা দেওয়া হয়।

চীন ও উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত মাউন্ট পেকতুকে কোরীয় জাতির পৌরাণিক জন্মভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরিয়ার প্রথম রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের সঙ্গে এই পর্বতের সম্পর্ক রয়েছে।

কয়েক হাজার বছর পর উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল–সাংও জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় এই অঞ্চলকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর ছেলে কিম জং–ইলের জন্মও এই পর্বতের সঙ্গে যুক্ত বলে উত্তর কোরিয়ার সরকারি প্রচারে দাবি করা হয়।

যদিও কিছু ঐতিহাসিকের মতে, কিম জং–ইল সম্ভবত রাশিয়ায় জন্মেছিলেন। তারপরও মাউন্ট পেকতুকে কিম পরিবারের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিয়ু হিয়ুন–উ তাঁর বই কিম জং উন’স সিক্রেট ভল্ট-এ লিখেছেন, তরুণ বয়সেই কিম জং–উনকে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তখন তাঁর উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না; মূল যোগ্যতা ছিল তিনি ‘পেকতু বংশধারার’ সদস্য।

মায়ের পরিচয় কেন অস্বস্তিকর?

কিম জং–উনের মা কো ইয়ং–হুইয়ের পারিবারিক ইতিহাস এই সরকারি বংশকাহিনির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

জীবনীকারদের তথ্য অনুযায়ী, কো ইয়ং–হুই ১৯৫২ সালে জাপানের ওসাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা–বাবা ছিলেন জেজু দ্বীপের কোরীয় বংশোদ্ভূত মানুষ।

তাঁদের পরিচয় ছিল ‘জাইনিচি কোরিয়ান’ হিসেবে। ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে জাপানে বসবাসকারী কোরীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে এই নামে পরিচিত করা হয়।

কো ইয়ং–হুইয়ের পরিবার ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ায় চলে যায়। ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে প্রায় ৯৩ হাজার কোরীয় বংশোদ্ভূত মানুষ জাপান থেকে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যান। উত্তর কোরিয়া তাদের জন্য উন্নত জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তবে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যাওয়ার পর এসব মানুষ সবসময় সমান মর্যাদা পাননি।

‘জ্যেপো’ পরিচয়ের সামাজিক বোঝা

উত্তর কোরিয়ার কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থাকে ‘সংবুন’ বলা হয়। অনেক বিশ্লেষক এটিকে এক ধরনের সামাজিক শ্রেণি কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করেন।

জাপান থেকে আসা কোরীয়দের অনেক সময় ‘জ্যেপো’ নামে ডাকা হতো। শব্দটি ছিল নেতিবাচক অর্থবোধক। তাঁদের বিদেশি প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সন্দেহজনক হিসেবে দেখা হতো।

এই শ্রেণির মানুষদের অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কারণেই কো ইয়ং–হুইয়ের পরিচয় কিম পরিবারের ‘পবিত্র’ বংশধারার প্রচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।

নর্দার্ন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক কিম হিয়ুং সু বলেন, শাসকগোষ্ঠীর কাছে পেকতু বংশধারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একজন ‘জ্যেপো’ নারীর সন্তান দেশের সর্বোচ্চ নেতা—এই বিষয়টি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে।

কিম জং–ইলের প্রিয় সঙ্গী

কো ইয়ং–হুইয়ের জীবনও ছিল ব্যতিক্রমী। সাধারণ জাইনিচি কোরিয়ানদের মতো সামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে না থেকে তিনি কিম পরিবারের ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যান।

কিম জং–ইলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়। তখন কিম জং–ইল ছিলেন উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ নেতা।

কিম জং–ইলের আনুষ্ঠানিক স্ত্রী কিম ইয়ং–সুক ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তার মেয়ে। কিন্তু কো ইয়ং–হুই ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম সঙ্গীদের একজন।

কো ইয়ং–হুই উত্তর কোরিয়ার একটি সাংস্কৃতিক দলের সদস্য ছিলেন। তাঁর সৌন্দর্য ও নৃত্যদক্ষতায় কিম জং–ইল আকৃষ্ট হন বলে বিভিন্ন জীবনীকার উল্লেখ করেছেন।

তাঁদের তিন সন্তান ছিল। তাঁদের একজন কিম জং–উন।

তবে উত্তর কোরিয়ার রক্ষণশীল সামাজিক ব্যবস্থায় বিয়ের বাইরে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা ছিল। ফলে কো ইয়ং–হুই ও তাঁর সন্তানদের দীর্ঘ সময় রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের বাইরে রাখা হয়েছিল।

জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি কো ইয়ং–হুইয়ের জীবনকে ‘সিন্ডারেলার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন—একজন সাধারণ পটভূমির নারী, যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

কেন প্রকাশ্যে স্বীকৃতি পাননি কো ইয়ং–হুই?

যদিও কিম জং–ইলের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ছিলেন কো ইয়ং–হুই, কিন্তু তাঁকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের সদস্য হিসেবে তুলে ধরা হয়নি।

কিম ইল–সাং জীবিত থাকাকালে কো ইয়ং–হুইকে পুত্রবধূ হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দেননি বলে অনেক গবেষকের ধারণা।

গবেষক চং সঙ–চাং বলেন, যদি কো ইয়ং–হুইকে স্বীকৃতি দেওয়া হতো, তাহলে কিম ইল–সাংয়ের সঙ্গে তাঁর সন্তানদের ছবি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হতো।

২০১১ সালে কিম জং–ইলের মৃত্যুর পর কো ইয়ং–হুইকে ঘিরে একটি সরকারি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা হয়। এতে তাঁকে কিম জং–ইলের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। তবে তাঁর নাম বা পারিবারিক পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

২০১২ সালে এই প্রামাণ্যচিত্রটি দলীয় কর্মকর্তাদের দেখানো হয়েছিল বলে জানা যায়। পরে এটি ফাঁস হয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সরকার দ্রুত এটি প্রত্যাহার করে নেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, কো ইয়ং–হুইয়ের পরিচয় প্রকাশ্যে এলে কিম পরিবারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—এই আশঙ্কাই এর পেছনে ছিল।

কীভাবে উত্তরসূরি হলেন কিম জং–উন?

কিম জং–উনের ক্ষমতায় আসার পথও ছিল জটিল।

কিম জং–ইলের বড় ছেলে কিম জং–নাম একসময় সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হতেন। তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে পড়াশোনা করেছিলেন এবং উত্তর কোরিয়ার বংশানুক্রমিক ক্ষমতা ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন।

পরে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যান। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ার একটি বিমানবন্দরে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে কিম জং–ইলের আরেক ছেলে কিম জং–চুলও উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। তবে তাঁকে নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত কিম জং–উনকে বেছে নেওয়া হয়।

সাংবাদিক অ্যানা ফিফিল্ড তাঁর বই দ্য গ্রেট সাকসেসর: দ্য সিক্রেট রাইজ অ্যান্ড রুল অব কিম জং–উন-এ লিখেছেন, কো ইয়ং–হুই নিজেও তাঁর ছেলেকে উত্তরসূরি করার বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন।

মায়ের পরিচয় এখনো স্পর্শকাতর বিষয়

কিম জং–উনের দাদা কিম ইল–সাং ও বাবা কিম জং–ইলের জন্মদিন উত্তর কোরিয়ায় জাতীয়ভাবে উদ্‌যাপন করা হয়। কিন্তু কিম জং–উনের জন্মদিন এখনো সরকারি ছুটির দিন নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি কারণ হতে পারে তাঁর জন্ম ও শৈশব নিয়ে আলোচনা শুরু হলে মায়ের পরিচয়ও সামনে চলে আসবে।

উত্তর কোরিয়ার নেতা হিসেবে কিম জং–উনের ব্যক্তিগত পরিচয়, পরিবার এবং শৈশবের তথ্য এখনো কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।

স্ত্রী ও কন্যাকে সামনে আনার কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, নিজের মায়ের পরিচয় নিয়ে যে সংকোচ ছিল, সেটি হয়তো কিম জং–উনকে তাঁর স্ত্রী রি সল–জু ও কন্যাকে তুলনামূলকভাবে দ্রুত জনসমক্ষে আনতে উৎসাহিত করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রি সল–জু তুলনামূলক উচ্চ সামাজিক অবস্থানের পরিবার থেকে এসেছেন এবং তিনি একটি সাংস্কৃতিক দলের সদস্য ছিলেন।

জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমির মতে, কিম জং–উন নিজের পরিবারের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য স্ত্রী ও সন্তানকে প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন।

‘পারিবারিক রহস্য ফাঁস হলে বড় ধাক্কা’

যদি কোনো দিন কিম জং–উনের মায়ের প্রকৃত পারিবারিক পরিচয় ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে আসে, তাহলে উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

নির্বাসিত কূটনীতিক রিয়ু হিয়ুন–উ বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে কিম জং–উনের মা জাপানপ্রবাসী কোরীয় পরিবারের সদস্য ছিলেন, তাহলে তা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বৈধতাই নয়, উত্তর কোরিয়ার বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

তাঁর ভাষায়, এর প্রভাব উত্তর কোরিয়ার সমাজে ‘পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো’ বড় ধাক্কা সৃষ্টি করতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স