টেবিলের নিচে রাখা ছোট আকারের একটি রোভার, পাশে সাজানো জলযান ও ড্রোনের মডেল। দেখতে সাধারণ হলেও এগুলোর পেছনে রয়েছে কৃষি ও মৎস্য খাতের আধুনিকায়নের স্বপ্ন। জমির অবস্থা বিশ্লেষণ, ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, মাছের চাষ পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকের সহায়তায় প্রযুক্তির ব্যবহার—এমনই এক সমন্বিত ধারণা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
তাদের এই উদ্ভাবনী ধারণা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং অষ্টম ও দশম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থীর চিন্তা থেকে তৈরি। সঙ্গে রয়েছেন দুই শিক্ষক। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’-এ নিজেদের প্রকল্প তুলে ধরেছে তারা।
ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, মহাকাশ, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন খাতে স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধানের ধারণা নিয়ে এসেছে শিক্ষার্থীরা।
কৃষি ও মৎস্যে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ‘রোদ্দুর’ দলের স্বপ্ন
আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আমজাদ হোসেন সাদিক বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত। সেই বাস্তবতা থেকেই তারা তিনটি প্রযুক্তি ইউনিট নিয়ে কাজ করছে—ফার্মিং রোভার, স্বয়ংক্রিয় জলযান এবং ড্রোন।
তাদের তৈরি ফার্মিং রোভার জমির অবস্থা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পরিচর্যার তথ্য ওয়েবসাইটে জানাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরার মাধ্যমে গাছের আক্রান্ত অংশ শনাক্ত করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থাও জানাবে প্রযুক্তিটি।
শিক্ষার্থীদের ধারণা অনুযায়ী, কোনো গাছের নির্দিষ্ট অংশ আক্রান্ত হলে এবং তা সংরক্ষণ সম্ভব না হলে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে ওই অংশ অপসারণ করা যাবে। এতে পুরো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
তাদের তৈরি স্বয়ংক্রিয় জলযান মাছ চাষের পানিতে অক্সিজেনসহ বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে ড্রোন কৃষি ও মৎস্য খাতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও সহায়ক কাজে ব্যবহার করা যাবে।
দলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মঈন উদ্দিন বলেন, বর্তমানে বাজারে থাকা অনেক রোভার মূলত রোগ দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু তাদের উদ্ভাবনের লক্ষ্য হলো রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। এতে কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কৃষকের কল্যাণ হবে।
১০১ দলের উদ্ভাবনী ধারণার প্রদর্শনী
শুধু কৃষি নয়, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের প্রদর্শনীতে দেখা যাচ্ছে আরও নানা ধরনের উদ্ভাবনী প্রকল্প। জেলা ও মহানগর পর্যায় থেকে নির্বাচিত ১০১টি দল জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বে নিজেদের বিজ্ঞান প্রকল্প, স্টার্টআপ ধারণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ উপস্থাপন করছে।
রোববার চলছে প্রদর্শনী ও বিচার কার্যক্রম। সোমবার অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের আওতায় প্রথমবারের মতো এই আয়োজন করা হয়েছে।
উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা
আয়োজক সূত্র জানায়, প্রতিযোগিতাটি উপজেলা বা থানা, জেলা এবং জাতীয়—এই তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের প্রোগ্রাম অফিসার তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী জানান, প্রথম ধাপে ১২ জুন দেশের ৫২১টি উপজেলা ও মহানগরীর শিক্ষা থানায় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৮ হাজার ২৯টি দলে ২৭ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থী এবং ১৬ হাজার ৫৮ জন শিক্ষক অংশ নেন।
পরে উপজেলা পর্যায় থেকে নির্বাচিত ৫৪৬টি দল জেলা পর্যায়ে অংশ নেয়। সেখান থেকে বাছাই করে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পেয়েছে ১০১টি দল।
রোবট থেকে রকেট, নানা স্বপ্নের প্রদর্শনী
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনের পরিধি ছিল বিস্তৃত।
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের সরকারি পাতারহাট মুসলিম মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছে এআই নিয়ন্ত্রিত বোমা নিষ্ক্রিয়করণ রোবট।
ঢাকার সরকারি বিজ্ঞান কলেজের তিন শিক্ষার্থী উপস্থাপন করেছে একটি রকেট প্রকল্প। দলের সদস্য রিফাত আহমেদ বলেন, তাদের লক্ষ্য নতুন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও যেন মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে, সেই অনুপ্রেরণা তৈরি করা।
কুড়িগ্রামের চিলমারী সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উপস্থাপন করেছে স্মার্ট সিটির ধারণা। কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছে বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিব্যক্তি প্রকাশে সহায়ক প্রযুক্তি।
নেত্রকোনার বারহাট্টার বাউসী অর্ধচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ওয়েবসাইটভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্মের ধারণা তুলে ধরেছে।
সেরা ১০ দল পাবে পুরস্কার
জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে সেরা ১০টি দল নির্বাচন করা হবে। বিজয়ী শিক্ষার্থীরা পাবেন ২০ হাজার টাকা ও সনদপত্র। বিজয়ী শিক্ষকদের জন্য রয়েছে ৩০ হাজার টাকা ও সনদপত্র।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রদর্শনী পরিদর্শন করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
স্থানীয় সমস্যার সমাধানে তরুণদের উদ্ভাবন
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এর আগে জানিয়েছিলেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধান খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি হবে।
তার মতে, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পথ তৈরি হতে পারে।
খুদে উদ্ভাবকদের এই আয়োজন শুধু প্রতিযোগিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তা তৈরির একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।