জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। প্রতিষ্ঠার পর দলটির যে অপেক্ষাকৃত অপ্রচলিত নেতৃত্ব কাঠামো ছিল, তা পরিবর্তন করে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের কাঠামোর কাছাকাছি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করা, দায়িত্বের বিভাজন স্পষ্ট করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করতেই এই পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুলাইয়ের শুরুতেই এনসিপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এই পরিবর্তন আনা হতে পারে। পুনর্গঠিত কমিটি প্রায় ছয় মাস দায়িত্ব পালন করবে। এরপর আগামী বছরের শুরুতে দলের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল বা সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘সুপার ইলেভেন’ থেকে ‘সুপার সিক্স’
এনসিপির বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোতে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে। এর মধ্যে আহ্বায়ক, সদস্যসচিব, মুখ্য সমন্বয়ক, দুইজন মুখ্য সংগঠক, মুখপাত্র, দুইজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, দুইজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক পদগুলোকে দলটির অভ্যন্তরে ‘সুপার ইলেভেন’ নামে অভিহিত করা হয়।
নতুন কাঠামোতে এই ১১টি পদের পরিবর্তে শীর্ষ নেতৃত্বে ছয়টি পদ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে ‘সুপার ইলেভেন’ পরিবর্তিত হয়ে হচ্ছে ‘সুপার সিক্স’।
এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এই পরিকল্পনার বিষয়ে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন জানিয়েছেন, নতুন কাঠামোয় ছয়টি পদ থাকবে—আহ্বায়ক, সদস্যসচিব, দুইজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং দুইজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব।
নাহিদ-আখতারই থাকছেন শীর্ষ দুই পদে
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, আহ্বায়ক পদে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব পদে আখতার হোসেন বহাল থাকছেন।
জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহ এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব পদে সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্ষদের দুই সদস্য জানিয়েছেন।
এই ছয়জনই বর্তমানে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য।
দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা
দলীয় সূত্র বলছে, রাজনৈতিক পর্ষদের অন্য ১২ সদস্যকে যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্যসচিব পদে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
নতুন কাঠামোয় পর্ষদের সদস্যদের আলাদা আলাদা বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কেউ দেখবেন জোট রাজনীতি, কেউ সাংগঠনিক কার্যক্রম, কেউ সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, আবার কেউ দেখবেন দপ্তরের কাজ।
এ ছাড়া দলের পেশাজীবী সংগঠন, ছাত্রসংগঠন, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মতো বিষয়েও আলাদা দায়িত্ব বণ্টন করা হবে।
দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন সম্পাদকীয় ও সহসম্পাদকীয় পদ তৈরির বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ কমাতেই পুনর্গঠন
এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, বর্তমান কাঠামোয় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। দলের অনেকেই এটিকে ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ হিসেবে উল্লেখ করছিলেন।
তাঁর মতে, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও সহজ করতে কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করছেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাড়বে। তাই সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে এখনই কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি
দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলছে। তবে এখনো বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের কোনো ফোরামে উপস্থাপন করা হয়নি।
এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার জানিয়েছেন, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই দলের নতুন কাঠামো চূড়ান্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের শুরুতে এনসিপির প্রথম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। সে পর্যন্ত পুনর্গঠিত কমিটিই দলের দায়িত্ব পালন করবে।
নতুন কাঠামোর মাধ্যমে দলটি নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রস্তুতিও এগিয়ে নিতে চায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।