নতুন বাজেটে ৬১টি নিত্যপণ্যের ওপর কর কমানো বা প্রত্যাহারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন বাজারে দেখতে চায় বিরোধী দল। বাজারে এর প্রভাব দেখা গেলে সাধারণ মানুষ এর সুফল পেয়েছে বলে বোঝা যাবে, আর তা না হলে এর সুবিধা কোনো সিন্ডিকেটের কাছে চলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
বুধবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, “বাজেটে ৬১টি নিত্যপণ্যে কর কমানো ও প্রত্যাহারের যে কথা বলা হয়েছে, তার প্রতিফলন আমরা বাজারে দেখতে চাই। জনগণ যদি এর সুফল পায়, তাহলে সেটিই হবে বাজেটের সফলতা। কিন্তু বাজারে এর প্রতিফলন না থাকলে বুঝতে হবে, সুবিধা জনগণের কাছে না গিয়ে কোনো সিন্ডিকেটের জন্য কাজ করছে।”
তিনি বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল এবং মুদিদোকানের মতো প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।
অর্থবছর পরিবর্তনের দাবি
দেশের আবহাওয়া ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থবছর পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা। বর্তমানে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত অর্থবছর চালুর পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থবছর করার পক্ষে মত দেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের দেশে একটা দানব আছে—উন্নয়নের দানব। এটা নয় মাস কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমায়, শেষের তিন মাস গা ঝাড়া দিয়ে চলে আসে। ঝড়ের গতিতে কাজ শুরু করে।”
তিনি বলেন, নয় মাসে ৪২ শতাংশ কাজ এবং শেষ তিন মাসে ৫০ শতাংশ কাজ করার প্রবণতার কারণে অনেক সময় জনগণের অর্থ অপচয় ও অনিয়মের শিকার হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “তখন বৃষ্টি-ঝড়ে জনগণের টাকা পানির সঙ্গে মিশে যায়—লুটপাট, অপচয়, হজম। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থবছর নির্ধারণ করা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতি বড় বাধা
শফিকুর রহমান বলেন, বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও দুর্নীতি। এই দুটি ক্ষেত্রে সংস্কার না আনলে বাজেটের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
তিনি বলেন, শুধু বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, বরং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘নরমও নয়, গরমও নয়’—দায়িত্বশীল বিরোধী দলের বার্তা
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা দায়িত্বশীল আচরণ করতে চান। জনগণের সমস্যা, সমাধান এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়েই সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “কাদা-ছোড়াছুড়ি ও চরিত্রহনন বাদ দিয়ে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সংসদ পরিচালিত হলে সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে জনগণের সংসদ।”
অনেকে সংসদ ‘গরম’ করার কথা বলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময়ের উত্তাপ অনেক ক্ষতি করেছে। এখন সেই উত্তাপ কমিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে।
তিনি বলেন, “৫৪ বছরের তাপে দেশ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সে তাপ ঠান্ডা করে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনার সময়।”
বিরোধী দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তাঁরা কোনো উসকানিতে পা দেবেন না। তাঁদের ভূমিকা হবে দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক—“নরমও নয়, গরমও নয়।”
‘তলে তলে’ সমঝোতার প্রশ্নে জবাব
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক আন্দোলন নিয়ে ‘তলে তলে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না’—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের কোনো তলা নাই, আমাদের গলা আছে।”
রাজপথের আন্দোলন সরকারের সঙ্গে সমঝোতার অংশ কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাদের কোনো সমঝোতার আন্দোলন নাই।”
তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জনগণের দাবি ও অধিকারকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে।
জুলাই জাদুঘর ও ফাউন্ডেশন নিয়ে প্রশ্ন
বাজেটে জুলাই জাদুঘর ও জুলাই ফাউন্ডেশনের জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকার বিষয়েও কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, “জুলাই কি হারিয়ে যাবে? জুলাই না থাকলে আমরা কোথায়? এই সংসদ কোথায়? এই সরকার কোথায়?”
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং এর চেতনা ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে অবস্থান
সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকারের প্রস্তাবিত বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়া প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা সংস্কার পরিষদের জন্য প্রস্তুত।
তাঁর মতে, সংবিধান সংশোধনের জন্য আলাদা কমিটি বা কমিশন গঠনের প্রয়োজন নেই। সংস্কারের বিষয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।
বিরোধীদলীয় সদস্যদের আসন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বিষয় ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিস্তা প্রকল্পে জাতীয় স্বার্থের ওপর গুরুত্ব
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা চান জাতীয় স্বার্থে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হোক।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এতে বন্ধুরা কেউ নাখোশ হবে না।”
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য দেশগুলোর কাছ থেকেও একই ধরনের সম্মান প্রত্যাশা করে।
তিনি বলেন, “স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি সব দেশের থাকুক, আমরা সম্মান করি। শুধু বাংলাদেশের নয়, আমরা আমাদের প্রতিবেশীদেরও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখি। তাদের কাছ থেকেও আমরা আমাদের প্রাপ্য সম্মান চাই।”
জামায়াত নেতাদের উপস্থিতি
মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলটির নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সাইফুল আলম খান, মো. নাজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ দলের অন্যান্য নেতারা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের সংসদ সদস্য সাঈদ উদ্দিন আহমদ হানজালাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।