একীভূত হওয়া ইসলামি ধারার পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে ‘হেয়ারকাট’ (আমানতের একটি অংশ কেটে নেওয়া) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আমানতকারীরা তাঁদের জমা রাখা অর্থ সুদসহ ফেরত পাবেন। তবে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগবে এবং আমানতকারীদের ধৈর্য ধরতে হবে।
বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
আমানতকারীদের দুর্ভোগের বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন রেহানা আক্তার রানু
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রেহানা আক্তার রানু আলোচনার সূত্রপাত করে বলেন, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের অর্থ পাচারের অভিযোগের কারণে বহু আমানতকারী তাঁদের নিজস্ব অর্থ উত্তোলনে সমস্যার মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, এসব অর্থ সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সঞ্চয়। অথচ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহক এখন সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন এবং তাঁরা তাঁদের আমানত ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
রেহানা আক্তার রানু ব্যাংক খাতে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, তাঁদের সম্পদ জব্দ ও নিলামের মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ গ্রহণ এবং সম্ভাব্য ‘হেয়ারকাট’ নীতি বাতিলের দাবি জানান।
‘হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি’, বললেন অর্থমন্ত্রী
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক খাতের এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হৃদয়বিদারক। তাঁর ভাষায়, একটি নির্বাচিত সরকার এ ধরনের পরিস্থিতির প্রতি উদাসীন থাকতে পারে না।
তিনি জানান, দেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ উদ্দেশ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন
অর্থমন্ত্রী জানান, রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, একীভূত হওয়ার ফলে ওই পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানত, দাবি ও গ্রাহকদের স্বার্থ নতুন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে কারা জড়িত, তা শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে বলেও জানান তিনি। অডিট প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের সম্পদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
ছয়টি বড় গ্রুপের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার মধ্যে প্রথম ধাপে ছয়টি মামলায় দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব মামলায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, শিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ এবং অরিয়ন গ্রুপের সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের অর্থ পুনরুদ্ধারের এ কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করা হবে।
‘হেয়ারকাট’ হবে না, তবে সময় লাগবে
আমানতকারীদের উদ্বেগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ নীতি অনুসরণ করা হবে না।
তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমানতকারীরা তাঁদের টাকা সুদসহ ফেরত পাবেন। তবে এ জন্য কিছুটা ধৈর্য ধারণ করতে হবে।”
কেন সময় প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বর্তমানে বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে রয়েছে এবং সেই লোকসান প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে আমানত ফেরত দেওয়া এবং অন্যদিকে সুদ পরিশোধ করা একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাইলেন আখতার হোসেন
একই অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপির সদস্য আখতার হোসেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত ভুয়া সনদধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তিনি অভিযোগ করেন, গত দেড় দশকে প্রশাসন, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাল বা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের মাধ্যমে বহু ব্যক্তি চাকরি পেয়েছেন। তাঁর দাবি, এসব ব্যক্তির একটি অংশ এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকতে পারে।
আখতার হোসেন আরও বলেন, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া ৯০ হাজার ৫২৭ জনের সনদ যাচাইয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে অন্তত ৮ হাজারটির ক্ষেত্রে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান।
সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস
জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়া অমুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, যারা ভুয়া সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো যাচাই–বাছাইয়ের মাধ্যমে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক