ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা দ্বিতীয় রাতেও সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার দিবাগত রাতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস, চাবাহার, সিরিক, কোনারাক, আবু মুসা দ্বীপ ও বুশেহর প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। হামলার পর কয়েকটি স্থানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয় এবং কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ইরানি সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বুধবার রাতের হামলাগুলো আগের রাতের অভিযানের ধারাবাহিকতা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এসব হামলায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণ
ইরানের সংবাদ সংস্থা ফারস ও মেহেরের বরাতে আল–জাজিরা জানিয়েছে, উপসাগরীয় উপকূলসংলগ্ন অন্তত দুটি এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, কোনারাক ও চাবাহারের আশপাশে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের পর চাবাহারের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বুশেহর প্রদেশেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেলেও সেখানকার পারমাণবিক স্থাপনা অক্ষত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর আব্বাসে অন্তত আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেখানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আবু মুসা দ্বীপ এবং দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক শহরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই নতুন এই হামলা পরিচালিত হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দিতেই ইরানের সামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতেও ইরানের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল সেন্টকম। তাদের দাবি, ওই অভিযানে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা এবং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা।
পাল্টা হামলার দাবি আইআরজিসির
মার্কিন হামলার জবাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
আইআরজিসির দাবি, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত ৮৫টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি এবং স্বাধীনভাবেও এ দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উত্তেজনার মধ্যেই চলছিল শোকানুষ্ঠান
মঙ্গলবার থেকে ইরানে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় উপলক্ষে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান চলছিল। সেই কর্মসূচির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে দাফনের কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের আগাম হুঁশিয়ারি
নতুন হামলার আগে তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমি সতর্ক করে দিচ্ছি, আজ রাতে আমরা তাদের ওপর কঠিন আঘাত হানব।”
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে পূর্বে হওয়া সমঝোতা কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে তেহরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটন সেই সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প আঙ্কারায় সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত শেষ।
ইরানের নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, তিনি আর তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা করতে আগ্রহী নন। তাঁর ভাষায়, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের আচরণ নৃশংস ও সহিংস।
তেহরানের পাল্টা সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসিন রাজেয়ি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে লেখেন, “যে তোমাকে লাঞ্ছিত করেছে, সে তোমাকে যেভাবে লাঞ্ছিত করেছে, তাকেও সেভাবে আক্রমণ কর।”
পোস্টে তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “আগ্রাসনকারী শত্রু ও তার সহযোগীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।”
এদিকে সর্বশেষ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা ও বিবিসি