নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে তরুণ শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে উদ্ভাবনী ধারণা আহ্বান করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ‘স্ফুরণ—টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের সন্ধানে’ শীর্ষক এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। প্রতিযোগীদের বাস্তবায়নযোগ্য ধারণার ওপর সর্বোচ্চ এক হাজার শব্দের কনসেপ্ট নোট এবং তিন মিনিটের একটি পিচ ভিডিও জমা দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের আয়োজনে প্রতিযোগিতাটির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগসংক্রান্ত নতুন ধারণা খোঁজা হচ্ছে।
আয়োজকদের লক্ষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক ও খাতসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এমন সব সমাধান সামনে আনা, যা বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব এবং দেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ের মধ্যে সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবহার ১৫ শতাংশ সাশ্রয়ের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কার্যকর পরিকল্পনা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে যেসব ধারণা দেওয়া যাবে
‘স্ফুরণ’ প্রতিযোগিতায় দুটি প্রধান ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ধারণা জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর প্রথমটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এ বিভাগে সৌরবিদ্যুৎ, স্মার্ট সোলার সেচব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে পরিচালিত অফ-গ্রিড ব্যবস্থা, গ্রিড আধুনিকায়ন এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন, দেশীয়ভাবে সৌর প্যানেল ও ইনভার্টার উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল এবং সীমিত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বিষয়ও এ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। কৃষিজমিতে কৃষিকাজের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত ব্যবস্থা অ্যাগ্রি-পিভি (Agri-PV) এবং জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি নিয়েও প্রতিযোগীরা তাঁদের ধারণা জমা দিতে পারবেন।
এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির কার্যকর ব্যবহার, বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিযোগীদের কাছ থেকে এমন ধারণা প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা দেশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তবায়নের উপযোগী।
জ্বালানি সাশ্রয় ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব
প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় বিভাগ নির্ধারণ করা হয়েছে জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে। এ ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস ও কমিউনিটি পর্যায়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন রান্নাব্যবস্থা এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে ধারণা দেওয়া যাবে।
এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং সেগুলোর চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়ন, ভবনে জ্বালানির ব্যবহার কমানো, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী শীতলীকরণ পদ্ধতি নিয়েও প্রস্তাব জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিদ্যমান স্থাপনা ও ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে জ্বালানি সাশ্রয়ের উপযোগী করে তোলার রেট্রোফিট সমাধানও এ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন আনা এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে নীতিগত উদ্যোগসংক্রান্ত প্রস্তাবও বিবেচনা করা হবে।
এ বিভাগের মাধ্যমে শুধু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন নয়, বিদ্যমান ব্যবস্থার উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানির অপচয় কমানোর কার্যকর উপায়ও সামনে আসতে পারে।
শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য আলাদা বিভাগ
প্রতিযোগিতাটি দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। গ্রুপ ‘এ’ রাখা হয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য। এ বিভাগে দেশের যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো বিভাগের দুজন শিক্ষার্থী দল গঠন করে অংশ নিতে পারবেন।
অন্যদিকে গ্রুপ ‘বি’ নির্ধারণ করা হয়েছে পেশাজীবীদের জন্য। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যেকোনো কর্মকর্তা বা গবেষক এ বিভাগে এককভাবে তাঁদের উদ্ভাবনী ধারণা জমা দিতে পারবেন।
শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পৃথক বিভাগ রাখার ফলে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নতুন চিন্তাভাবনা, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ ধারণা সামনে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব সমস্যার সমাধানে এসব ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আবেদন করতে যা জমা দিতে হবে
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আগ্রহী ব্যক্তি বা দলকে তাঁদের প্রস্তাবিত ধারণার ওপর সর্বোচ্চ এক হাজার শব্দের একটি কনসেপ্ট নোট জমা দিতে হবে। এতে প্রস্তাবিত উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং সম্ভাব্য প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
কনসেপ্ট নোটের পাশাপাশি ধারণাটির পক্ষে যুক্তি ও বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করে তিন মিনিটের একটি পিচ ভিডিও জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভিডিওতে প্রস্তাবিত সমাধানের মূল বিষয়, এর প্রয়োজনীয়তা এবং প্রত্যাশিত সুফল সংক্ষেপে উপস্থাপন করতে হবে।
প্রতিযোগীদের এমন ধারণা উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, যা শুধু তাত্ত্বিক নয়; বরং দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বাস্তব চাহিদা পূরণে কাজে লাগানো সম্ভব।
নিবন্ধনের শেষ সময় ২৫ অক্টোবর
বিদ্যুৎ বিভাগের এ উদ্যোগে অংশ নিতে আগ্রহী শিক্ষার্থী, গবেষক ও পেশাজীবীদের আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে নির্ধারিত ওয়েবসাইটে অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। নিবন্ধন, অংশগ্রহণের শর্ত এবং ধারণা জমা দেওয়ার বিস্তারিত তথ্য জানতে আয়োজকদের প্রকাশিত ঘোষণা এখানে দেখুন।
দেশের জ্বালানি খাতে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে নতুন সমাধান খুঁজে বের করাই এ প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, গবেষণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও জ্বালানি সাশ্রয়ের নতুন পথ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা করছে আয়োজক বিদ্যুৎ বিভাগ।