ঢাকা

ভোট চুরির অভিযোগের পর বিক্ষোভস্থল নিয়েও মোদি সরকারকে আক্রমণ রাহুলের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের; নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত

ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নেমেছে বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া’। এবার বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থানেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সরকার বিরোধীদের আন্দোলনের অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর ভাষায়, ভোট চুরির পর মোদি সরকার এবার বিক্ষোভের স্থানও চুরি করতে চাইছে। গণতন্ত্র, সংবিধান ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় এই চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।

মঙ্গলবার বিকেলে দিল্লিতে রাহুল গান্ধীর সরকারি বাসভবনে আয়োজিত চা-চক্রের পর বিরোধী জোটের নেতারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তাঁদের সঙ্গে ছাত্রসংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন আন্দোলনের নেতারাও অংশ নেন। তাঁরা জানান, নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

রাহুল গান্ধী বলেন, ‘এই লড়াই একটাই। সবাই একজোট হয়ে একটাই লড়াইয়ে নেমেছি। এখানে কোনো সমান্তরাল লড়াই হচ্ছে না। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটাই—গণতন্ত্র রক্ষা। সংবিধান অক্ষত রাখা। গণতান্ত্রিক অধিকার অটুট রাখা।’

তিনি আরও বলেন, বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করতে ভোট চুরির পর সরকার এবার বিক্ষোভের স্থানও কেড়ে নিচ্ছে। তাঁরা এটি হতে দেবেন না এবং সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাবেন।

তবে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি রাহুল। তিনি বলেন, লক্ষ্য অর্জন করেই তাঁরা থামবেন। কীভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন করা হবে, তা আপাতত প্রকাশ করতে চান না বলেও জানান তিনি।

বিরোধীদের পাশাপাশি ছাত্র ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা

মঙ্গলবার সকালেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় রাহুল গান্ধী বিরোধী নেতাদের পাশাপাশি ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানানোর কথা জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, গণতন্ত্র রক্ষার এই আন্দোলনে সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

চা-চক্রে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বিভিন্ন দলের নেতাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) নেত্রী নেহা বোরাসহ অন্যরা।

বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধী অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেন। এতে আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্যও সামনে আসে।

বিহারের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতা তেজস্বী যাদব বলেন, যাঁরা অপরাধ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো মূল্যে গণতন্ত্র রক্ষা করা হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

আইসা নেত্রী নেহা বোরা বলেন, আন্দোলনকারীরা ঐক্যবদ্ধ। তাঁর ভাষায়, তাঁদের সবার শত্রু এক এবং সেই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল শক্তি হলো ঐক্য।

সমাজবাদী পার্টির নেত্রী ইক্রা হাসান বলেন, সোমবারের জনসমাগম থেকে বোঝা গেছে, জনসমর্থন কোন দিকে রয়েছে। তিনি আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানান।

একই দলের নেতা পুষ্পেন্দ্র সরোজ নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার নির্বাচন কমিশনের প্রধানকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করার কথাও বলেন তিনি।

সিপিআই নেতা ডি রাজা, তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী সাগরিকা ঘোষসহ অন্য নেতারাও বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ওপর গুরুত্ব দেন। শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের কঠোর সমালোচনা করে তাঁকে ‘মাফিয়া’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর অভিযোগ, সাংবিধানিক পদে থেকে জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচনব্যবস্থাকে অপরাধপ্রবণ করে তুলেছেন।

এসব বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বিরোধী দলের প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বিরোধীদের অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের জবাব এখানে উল্লেখ নেই।

যন্তর মন্তরে ঢুকে আটক সিজেপির নেতারা

সোমবার সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিরোধীদের অভিযানের পর মঙ্গলবার দিল্লির পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক শান্ত। এদিন বড় কোনো প্রকাশ্য আন্দোলন কর্মসূচি না থাকলেও সকালে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করে বিক্ষোভের চেষ্টা করেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) কয়েকজন নেতা।

দলটির আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডে কয়েকজন সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে যন্তর মন্তরের লোহার গেট টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। তাঁদের সঙ্গে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন সমর্থক ছিলেন। তাঁদের হাতে জাতীয় পতাকা ছিল এবং তাঁরা জ্ঞানেশ কুমার ও বিজেপিবিরোধী স্লোগান দেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাঁদের আটক করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপির নেতাদের সন্ধ্যা পর্যন্ত মুক্তি দেওয়া হয়নি। তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।

যন্তর মন্তরে প্রবেশ ও বিক্ষোভের এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বিরোধীরা প্রতিবাদের অধিকার এবং বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণের বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

সুপ্রিম কোর্টে শুনানি পিছিয়েছে

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি এবং আন্দোলনকারীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দিল্লি পুলিশ, সরকার ও মেট্রো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে।

তবে মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়নি। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর বেঞ্চের অন্যতম বিচারপতি ভি মোহনার অসুস্থতার কারণে শুনানি পিছিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে, আন্দোলনের কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির অভিযোগ তুলে দিল্লির ব্যবসায়ী মহলও দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। তাঁদের দাবি, বিক্ষোভ-আন্দোলনের কারণে প্রায় ২ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে।

আবেদনকারীরা বিক্ষোভের জন্য সরকার নির্ধারিত নতুন স্থান ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন এবং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, আন্দোলনের অধিকার বজায় রাখার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের চলাচলও নিশ্চিত করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে একদিকে বিরোধীরা বিক্ষোভের অধিকার ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহল আন্দোলনের কারণে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি আদালতে উত্থাপন করেছে। আদালতের শুনানিতে এসব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআর বাতিলের দাবি

নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে সিজেপি ও ‘ইন্ডিয়া’ জোট পৃথকভাবে আন্দোলন করছে। দুই পক্ষই বলছে, তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই এবং তাদের লক্ষ্য একই।

তবে দুই পক্ষের আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সোমবারের সুপ্রিম কোর্ট অভিযান এবং মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে সিজেপির নেতাদের আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণে পার্থক্যের অভিযোগও সামনে এসেছে।

সিজেপির নেতা অভিজিৎ দিপকে মঙ্গলবার এক বার্তায় দাবি করেন, সরকারই দুই আন্দোলনের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্য, সিজেপিকে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়ার সময় প্রচার করা হয়েছিল যে দলটি বিজেপির ‘বি টিম’ এবং বিজেপিই তাদের সামনে এনেছে। অন্যদিকে, সোমবার ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বড় অভিযানের সময় সিজেপির মতো একই ধরনের আচরণের মুখোমুখি হতে হয়নি বিরোধী জোটকে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

দিপকের দাবি, সরকার বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করতে চাইছে। এর ফলে একটি পক্ষ অন্য পক্ষকে সন্দেহ করতে শুরু করে এবং বৃহত্তর আন্দোলনের ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিভাজনের ফাঁদে না পড়ার আহ্বান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় অভিজিৎ দিপকে আন্দোলনকারীদের নিজেদের মধ্যে বিভেদ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকার কখনো একটি দলকে বিক্ষোভের সুযোগ দিয়ে অন্যদের দমন করতে পারে, আবার অন্য সময়ে এর উল্টো কৌশলও নিতে পারে। এভাবে আন্দোলনকারীদের পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোই সরকারের উদ্দেশ্য বলে তিনি অভিযোগ করেন।

দিপকে আরও বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য থেকে যেন কেউ সরে না যায়। তাঁর ভাষায়, লড়াইটা জ্ঞানেশ কুমার ও তাঁর রক্ষাকর্তাদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও বিভাজন তৈরি হলে মূল দাবি দুর্বল হয়ে পড়বে।

সিজেপি ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আন্দোলন পৃথকভাবে পরিচালিত হলেও উভয় পক্ষের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল। ফলে কর্মসূচি ও কৌশলে পার্থক্য থাকলেও দাবির জায়গায় মিল রয়েছে বলে সিজেপির নেতারা দাবি করছেন।

আন্দোলনের সামনে ঐক্য ও আইনি লড়াইয়ের প্রশ্ন

রাহুল গান্ধীর বাসভবনে বিরোধী নেতাদের চা-চক্রের পর ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা এবং যন্তর মন্তরে সিজেপির নেতাদের আটকের ঘটনা দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি প্রতিবাদের সুযোগও সীমিত করতে চাইছে। অন্যদিকে, বিক্ষোভের স্থান ও কর্মসূচি ঘিরে আইনি বিরোধ এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এখন বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে যন্তর মন্তর-সংক্রান্ত মামলার শুনানি, নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি এবং এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের অবস্থান—এসব বিষয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাহুল গান্ধী আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত না জানালেও স্পষ্ট করেছেন, গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার দাবিতে তাঁরা পিছিয়ে যাবেন না। বিরোধী জোটের নেতারা বলছেন, আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের লড়াই চলবে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স