ঢাকা

মমতার ওপর হামলার চেষ্টা নিয়ে দুই রকম ভাষ্য, অভিযোগ বনাম পুলিশের বক্তব্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

কালীঘাটের বাসভবনের সামনে নারী আটক, তৃণমূলের অভিযোগে ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত; হামলার দাবি নিশ্চিত করেনি পুলিশ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর ছুরি নিয়ে হামলার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলকাতার কালীঘাটে নিজের বাসভবন থেকে বের হওয়ার সময় এক নারী তাঁকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেছে তৃণমূলের মমতা-অংশ। তবে পুলিশ হামলা কিংবা ছুরি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। পুলিশের ভাষ্য, ঘটনাটি নিয়ে ওই নারীর সঙ্গে মমতার পক্ষের লোকজনের উত্তপ্ত বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে তাঁকে আটক করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক দোলা সেন পুলিশের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে ওই নারীর নাম তন্নিষ্ঠা সাহা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরে পুলিশ তাঁর পরিচয় অনুসূয়া সাহা, বয়স ৩৮ বছর বলে জানিয়েছে। ফলে অভিযোগে উল্লেখ করা নাম এবং পুলিশের দেওয়া পরিচয়ের মধ্যে অমিল রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বের হওয়ার সময় ওই নারী তাঁর মুখোমুখি হন। এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাঁকে আটক করেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ জমা পড়েছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তৃণমূলের অভিযোগ, ছুরি নিয়ে হামলার চেষ্টা

দোলা সেনের অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটের বাসভবন থেকে বের হচ্ছিলেন। এ সময় ওই নারী তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি মমতার দিকে মারমুখী হয়ে এগিয়ে যান এবং হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দোলা সেন অভিযোগে লেখেন, ‘তিনি গালিগালাজ করছিলেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে মারমুখী হয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় অষ্টম মুখ্যমন্ত্রীকে আঘাত করতে তিনি রাস্তায় শুয়েও পড়েন।’

তৃণমূলের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই নারী মাদকাসক্ত ছিলেন। তবে তাঁর মাদক গ্রহণের অভিযোগের পক্ষে কোনো পরীক্ষার ফল বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

দলটির প্রশ্ন, জেড-প্লাস নিরাপত্তা পাওয়া একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেত্রীর বাসভবনের কাছে ওই নারী কীভাবে পৌঁছালেন। এ ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তৃণমূলের মমতা-অংশ।

পরিচয় নিয়ে দুই ধরনের তথ্য

ঘটনার পর তৃণমূলের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগে ওই নারীর নাম তন্নিষ্ঠা সাহা বলা হয়। দোলা সেনের দাবি, তিনি একজন সিভিক ভলান্টিয়ার এবং নিজেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাগনি বলে পরিচয় দিয়েছেন।

তবে কয়েক ঘণ্টা পর কলকাতা পুলিশের বিবৃতিতে ওই নারীর নাম অনুসূয়া সাহা এবং বয়স ৩৮ বছর বলে জানানো হয়। পুলিশি বিবৃতিতে তাঁকে সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে, তিনি মমতার আত্মীয় বলে দাবি করেছিলেন কি না, সে বিষয়েও পুলিশের বক্তব্যে বিস্তারিত নেই।

সিভিক ভলান্টিয়াররা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের অধীনে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, জনসমাগম সামলানো এবং জননিরাপত্তাসংক্রান্ত কাজে তাঁরা পুলিশকে সহায়তা করেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা পরিচয় ও পুলিশের দেওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় ওই নারীর পরিচয়, তাঁর সঙ্গে মমতার সম্পর্কের দাবি এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

পুলিশের বক্তব্যে ‘বাগ্‌বিতণ্ডা’

ঘটনা সম্পর্কে কলকাতা পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বাসভবন থেকে বের হওয়ার সময় সেখানে একটি ঘটনা ঘটে। অনুসূয়া সাহা নামের এক নারী তাঁর মুখোমুখি হন। এ নিয়ে উত্তপ্ত বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ওই নারীকে আটক করেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তৃণমূলের সদস্যরা এ বিষয়ে একটি অভিযোগ জমা দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে পুলিশের বিবৃতিতে ছুরি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর সরাসরি হামলার চেষ্টার অভিযোগও পুলিশ নিশ্চিত করেনি। ফলে তৃণমূলের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে তদন্তের ফল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আলামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সাকেত গোখলের পোস্টে ষড়যন্ত্রের প্রশ্ন

তৃণমূলের মুখপাত্র সাকেত গোখলে পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগের একটি অনুলিপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, একজন মাদকাসক্ত নারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে পৌঁছে ছুরি নিয়ে তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা করেছেন।

গোখলে লেখেন, ‘আজ একজন মাদকাসক্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পৌঁছে ছুরি নিয়ে তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা করেছেন। বাংলার অবস্থা এমনই যে জেড-প্লাস নিরাপত্তা পাওয়া তিনবারের মুখ্যমন্ত্রীও নিরাপদ নন।’

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, দিল্লিতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এটি বিজেপির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র কি না।

তবে গোখলের পোস্টে উত্থাপিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশও এখন পর্যন্ত ঘটনাটিকে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বলে ঘোষণা করেনি। ফলে বিষয়টি তৃণমূল নেতার অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।

ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল নেতাদের ওপর হামলার অভিযোগ

গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে টানা তিন মেয়াদের শাসনের পর ক্ষমতা হারায় তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। ক্ষমতা হারানোর পর থেকে তৃণমূলের মমতা-অংশের নেতা-কর্মীরা কয়েকটি হামলার শিকার হয়েছেন বলে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

গত আগস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, কলকাতার শ্যামবাজার এলাকায় তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে একটি বড় পাথর ছোড়া হয়েছিল। এতে তাঁর বুকে ব্যথা হয়, যা কয়েক দিন স্থায়ী ছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

এর আগে মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক দিন পর দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ইট-পাথর ও ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটে বলে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

গত শনিবার বারুইপুর পূর্বের বিধায়ক বিভাস সরদারের গাড়িতেও হামলার অভিযোগ ওঠে। বিভাস সরদার জানান, একদল লোক তাঁর গাড়ি ঘিরে ধরে, তাঁকে হত্যার হুমকি দেয় এবং গাড়ির সামনের কাচে ইট ছোড়ে। তাঁর দাবি, তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

এসব ঘটনার কারণে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার দায়, উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আলাদাভাবে তদন্ত করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তদন্তের ফলের অপেক্ষা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের সামনে মঙ্গলবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা গেছে। তৃণমূলের দাবি, ওই নারী ছুরি নিয়ে হামলার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে, পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে উত্তপ্ত বাগ্‌বিতণ্ডা হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং ছুরি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

এ ছাড়া ওই নারীর পরিচয় নিয়েও অভিযোগ ও পুলিশের তথ্যে অমিল রয়েছে। তিনি সিভিক ভলান্টিয়ার কি না, নিজেকে মমতার ভাগনি বলে পরিচয় দিয়েছিলেন কি না এবং ঘটনাটির পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

পুলিশের তদন্তে এসব বিষয় পরিষ্কার হলে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত হামলা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগগুলোকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করাই সমীচীন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স