কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের আলোচনা, আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন বহাল থাকার কথা; তবে ‘সুপার সিক্স’ নিয়ে আপত্তি সারোয়ার তুষারের
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে দলটির ভেতরে আলোচনা চলছে। পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার কথা জানা গেছে। একই সঙ্গে দলের শীর্ষ দুই পদে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন বহাল থাকছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এনসিপির দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, মঙ্গলবার কিংবা বুধবার পুনর্গঠিত কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে। দলীয় নেতারা বলছেন, নেতৃত্বের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে নেতাদের কার্যক্রম, সক্রিয়তা ও পারফরম্যান্স বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পেতে পারেন। অন্যদিকে, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব করার আলোচনা রয়েছে। তবে কমিটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে এসব পদবণ্টনকে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বর্তমানে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের ১১টি পদকে দলটির ভেতরে ‘সুপার ইলেভেন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে এই কাঠামো ছোট করে ছয়জনের একটি শীর্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে ‘সুপার সিক্স’ নামে কোনো আলাদা নেতৃত্ব ফোরাম থাকার বিষয়টি নাকচ করেছেন দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার।
প্রতিষ্ঠার পর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের উদ্যোগ
নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক ও আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দলের মুখ্য সমন্বয়ক, হাসনাত আবদুল্লাহ দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং সারজিস আলম উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অন্যদিকে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এনসিপিতে যোগ দেন। পরে তাঁকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দলীয় সূত্র বলছে, এনসিপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক তৎপরতা ও জাতীয় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন নেতার ভূমিকা দলের ভেতরে তাঁদের অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে। পুনর্গঠনের মাধ্যমে সেই ভূমিকার প্রতিফলন নেতৃত্বের পদবণ্টনে ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দলের নেতাদের একাংশের মতে, শুরুতে আহ্বায়ক কমিটি হিসেবে যাত্রা শুরু করা এনসিপিতে পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন নেতা যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদও তৈরি করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাঠামো জটিল হয়ে ওঠায় এখন তা পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
শীর্ষ দুই পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে দলটির তিনজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন তাঁদের বর্তমান পদেই থাকছেন। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যসংখ্যা ১৬। আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব পদাধিকারবলে এই পর্ষদের সদস্য।
সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত নেতৃত্বে পাটওয়ারী, হাসনাত, সারজিস ও আসিফকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজনৈতিক পর্ষদের অন্য ১০ সদস্যকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও জানা গেছে।
তাঁরা হলেন আবদুল্লাহ আল আমিন, আরিফুল ইসলাম আদীব, আতিকুর রহমান মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আলী আহসান জুনায়েদ, সারোয়ার তুষার, আকরাম হুসাইন, সালেহউদ্দিন সিফাত, মাহমুদা আলম মিতু ও নুসরাত তাবাসসুম।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্যসচিবদের মধ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন করা হবে। তাঁরা মূলত দলের সহযোগী সংগঠন ও বিভিন্ন সেলের কার্যক্রম তদারক করবেন।
সংসদেও প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এনসিপির
বর্তমান জাতীয় সংসদে এনসিপির আটজন সদস্য রয়েছেন। তাঁরা হলেন নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিকুর রহমান, আবদুল হান্নান মাসউদ, মাহমুদা আলম ও নুসরাত তাবাসসুম। তাঁদের মধ্যে মাহমুদা আলম ও নুসরাত তাবাসসুম সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য।
দলটির সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা বাড়ার প্রেক্ষাপটে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব বণ্টন এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর তদারকিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
‘পারফরম্যান্স’ বিবেচনায় পুনর্গঠন
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন প্রথম আলোকে বলেন, দলটি আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে অনেকেই দলে যুক্ত হন। তাঁদের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদ তৈরি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা এখন দল অনুভব করছে।
নেতাদের কার্যক্রম ও সক্রিয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মনিরা শারমিন বলেন, নিজেদের কার্যক্রমের মাধ্যমে এনসিপির অনেক নেতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন, আবার অনেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় ছিলেন না। এসব বিষয় বিবেচনা করেই দলীয় কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তাঁর বক্তব্যে পুনর্গঠনের পেছনে দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—দলের বিস্তারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব বণ্টন এবং নেতাদের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সাংগঠনিক অবস্থান নির্ধারণ।
‘সুপার ইলেভেন’ থেকে ‘সুপার সিক্স’—কী পরিবর্তনের আলোচনা
এনসিপির বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোয় আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের পাশাপাশি মুখ্য সমন্বয়ক, দুই মুখ্য সংগঠক, মুখপাত্র, দুই জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, দুই জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়কের পদ রয়েছে। সব মিলিয়ে এই ১১টি পদকে দলটির নেতৃত্বের ‘সুপার ইলেভেন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই শীর্ষ নেতৃত্বের কাঠামো ছয়জনের মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সে কারণে ‘সুপার ইলেভেন’ থেকে ‘সুপার সিক্স’-এ যাওয়ার আলোচনা সামনে এসেছে।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত জানুয়ারিতেও এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের আলোচনা হয়েছিল। সে সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দলের কার্যক্রমে গতি আনতে কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। ২০২৭ সালের শুরুতে দলের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও তখন জানা গিয়েছিল। তবে সে সময় পুনর্গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
‘সুপার সিক্স’ নিয়ে আপত্তি সারোয়ার তুষারের
এদিকে, এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার ‘সুপার সিক্স’ নামে কোনো ফোরাম থাকার দাবি নাকচ করেছেন। প্রথম আলোর অনলাইনে পুনর্গঠনসংক্রান্ত খবর প্রকাশের প্রায় এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট পর মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
সারোয়ার তুষার বলেন, এনসিপিতে ‘সুপার সিক্স’ বলতে কোনো ফোরামের অস্তিত্ব নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হলো পলিটিক্যাল কাউন্সিল বা রাজনৈতিক পর্ষদ। এই পর্ষদের সদস্যসংখ্যা ১৬ এবং তাঁরা সবাই দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা।
বিভ্রান্তি না ছড়ানো এবং বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সারোয়ার তুষারের বক্তব্যের ফলে কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ‘সুপার সিক্স’ ধারণার ব্যাখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একদিকে দলীয় সূত্রের বরাতে চার নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার পরিকল্পনা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কাঠামো ছোট করার আলোচনা সামনে এসেছে; অন্যদিকে, রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার স্পষ্ট করেছেন যে ‘সুপার সিক্স’ নামে কোনো আলাদা ফোরাম নেই।
সব মিলিয়ে এনসিপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত পদবণ্টন এবং নতুন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক রূপ জানতে দলের ঘোষণার অপেক্ষা করতে হবে।