ভারতের সংসদের আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনকে সামনে রেখে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ নতুন করে রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি-এসপি) সংসদে আসন পুনর্বিন্যাস ও নারী সংরক্ষণ–সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল শর্তসাপেক্ষে সমর্থনের ইঙ্গিত দেওয়ায় জোটের ভবিষ্যৎ ও ঐক্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে আম আদমি পার্টি (আপ), তৃণমূল কংগ্রেস এবং উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনায় ভাঙনের পর এবার শরদ পাওয়ারের দলকেও নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা চালাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংশোধনী বিল পাসে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করতেই বিরোধী শিবিরে ধারাবাহিকভাবে ভাঙন তৈরির কৌশল নিয়েছে বিজেপি।
বিরোধী শিবিরে ধারাবাহিক ভাঙন
ভারতীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হবে আগামী সোমবার। তার আগেই বিরোধী শিবিরে একের পর এক ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে।
রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টির (আপ) ১০ সদস্যের মধ্যে সাতজন বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস থেকেও একাধিক সাংসদ দলত্যাগ করেছেন। লোকসভায় তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ বিজেপিকে সমর্থন জানিয়ে নতুন গঠিত একটি রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-এ যোগ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যসভার তিন সদস্য পদত্যাগ করে বিজেপির সমর্থনে পুনর্নির্বাচনের পথে রয়েছেন।
এ ছাড়া উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার নয়জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে ছয়জন একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় যোগ দিয়ে এনডিএ জোটের অংশ হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে এখন বিজেপির লক্ষ্য শরদ পাওয়ারের দল এনসিপি (এসপি) বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
নারী সংরক্ষণ বিলে শর্তসাপেক্ষ সমর্থনের ইঙ্গিত
শরদ পাওয়ারের কন্যা এবং এনসিপি (এসপি)-র শীর্ষ নেতা সুপ্রিয়া সুলে জানিয়েছেন, সরকার যদি নতুন সংবিধান সংশোধনী বিলে প্রতিটি রাজ্যের লোকসভা আসনসংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের দল বিলটির প্রতি সমর্থন বিবেচনা করতে পারে।
এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, একই বিলের বিরোধিতা করেছিল বিরোধী জোট, যখন এটি বাজেট অধিবেশনে সংসদে উত্থাপিত হয়েছিল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিরোধী জোটে থেকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনী বিলকে সমর্থন করলে শরদ পাওয়ারের দলের অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
বিজেপির লক্ষ্য দুই সংবিধান সংশোধনী বিল
সংসদের এবারের অধিবেশনে বিজেপি সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করাতে চায়।
প্রথমটি হলো সংসদে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ এবং লোকসভা ও বিধানসভায় আসনসংখ্যা বৃদ্ধির বিল।
দ্বিতীয়টি ‘এক দেশ, এক ভোট’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব, যার মাধ্যমে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন একই সময়ে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই এসব পরিবর্তন কার্যকর করা।
কেন গুরুত্বপূর্ণ দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন
ভারতের সংবিধান সংশোধনের জন্য লোকসভা ও রাজ্যসভায় উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
বাজেট অধিবেশনে এই সমর্থন না পাওয়ায় সরকার বিলটি পাস করাতে পারেনি।
লোকসভার মোট আসন ৫৪৩ হলেও বর্তমানে তিনটি আসন শূন্য রয়েছে। ফলে কার্যকর সদস্যসংখ্যা ৫৪০। সব সদস্য উপস্থিত থাকলে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের জন্য প্রয়োজন হবে ৩৬০ ভোট।
গত বাজেট অধিবেশনে বিলটির পক্ষে ভোট পড়েছিল ২৯৮টি এবং বিপক্ষে ২৩০টি।
পরবর্তীতে বিরোধী শিবিরে ভাঙনের ফলে লোকসভায় এনডিএর শক্তি বেড়ে বর্তমানে ৩১৯-এ পৌঁছেছে। শরদ পাওয়ারের দলের আটজন সদস্য সমর্থন দিলে তা বেড়ে ৩২৭ হবে। তবুও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আরও ৩৩টি ভোটের ঘাটতি থাকবে।
ডিএমকে ও সমাজবাদী পার্টির দিকে নজর
এই ঘাটতি পূরণে বিজেপির নজর এখন ডিএমকে ও সমাজবাদী পার্টির দিকে।
লোকসভায় ডিএমকের ২২ এবং সমাজবাদী পার্টির ৩৭ জন সদস্য রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসব দলের সদস্যদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করা যায় অথবা ভোটাভুটির সময় তাঁরা অনুপস্থিত থাকেন কিংবা ওয়াকআউট করেন, তাহলে সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে।
এ ছাড়া ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম)-এর তিনজন সদস্যসহ ছোট ছোট আঞ্চলিক দলগুলোকেও নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে বিজেপি।
রাজ্যসভাতেও একই চ্যালেঞ্জ
রাজ্যসভায়ও সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, এনডিএর সম্ভাব্য সমর্থন রয়েছে ১৫৫ সদস্যের। শরদ পাওয়ারপন্থী একজন সদস্য সমর্থন দিলে তা ১৫৬-এ পৌঁছাবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য তখনও অন্তত আটটি ভোট কম থাকবে।
আগামী ২৪ জুলাই রাজ্যসভার তিনটি শূন্য আসনের ফল ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। এই আসনগুলো তৃণমূল কংগ্রেসের তিন সদস্যের পদত্যাগে শূন্য হয়েছিল।
বিরোধীদের অভিযোগ
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের পথ সহজ করতে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ইডি, সিবিআই এবং আয়কর বিভাগকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মদন মিত্রের দলত্যাগ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) তলব করার পরই তিনি দল ছেড়ে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধী জোটের নেতাদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হলেই বিজেপি সংসদে নতুন করে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করবে।
এক বিরোধী নেতার ভাষায়, ‘এবার আমরা হারার জন্য বিল আনব না।’
রাজনৈতিক তাৎপর্য
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, শরদ পাওয়ারের এনসিপি (এসপি) কি ‘ইন্ডিয়া’ জোটে থেকেও বিজেপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনী বিলকে সমর্থন করবে, নাকি জোটগত অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখবে।
একদিকে বিজেপি সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে বিরোধী শিবিরে ভাঙনের কৌশল অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে বর্ষাকালীন অধিবেশনে নারী সংরক্ষণ বিল, আসন পুনর্বিন্যাস এবং ‘এক দেশ, এক ভোট’–সংক্রান্ত বিতর্ক ভারতের জাতীয় রাজনীতিকে নতুন মোড়ে নিয়ে যেতে পারে।