ঢাকা

উলফার পরেশ বড়ুয়াকে নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান ঘিরে প্রশ্ন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মার একটি মন্তব্য ঘিরে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নিষিদ্ধ সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম (উলফা)–এর (স্বাধীনপন্থী অংশ বা উলফা-আই) প্রধান পরেশ বড়ুয়াকে ভারতীয় রাষ্ট্র একজন পলাতক ও সন্ত্রাসী নেতা হিসেবে বিবেচনা করে এলেও, মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, প্রকাশ্য স্থানে যদি কোনো বিপ্লবীর ছবি আঁকতেই হয়, তাহলে বিদেশি বিপ্লবী চে গুয়েভারার পরিবর্তে আসামের পরেশ বড়ুয়ার ছবি আঁকাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আসামের রাজনৈতিক মহল, নাগরিক সমাজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যাঁকে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাঁকে কি এখন আসামের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে?

জুবিন গার্গের দেয়ালচিত্র ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত

সম্প্রতি গুয়াহাটির একটি উড়ালসড়কের নিচে জনপ্রিয় অসমিয়া সংগীতশিল্পী জুবিন গার্গের একটি দেয়ালচিত্র আঁকেন শিল্পী মার্শাল বড়ুয়া। ছবিটি এমনভাবে আঁকা হয়েছিল, যা অনেকের কাছে লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার প্রতিকৃতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়।

এর কিছুদিন পর ছবিটি মুছে ফেলা হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই এটিকে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি অবমাননা হিসেবে আখ্যা দেন।

এই বিতর্কের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা মন্তব্য করেন, বিদেশি বিপ্লবী চে গুয়েভারার আদলে ছবি আঁকার পরিবর্তে যদি বিপ্লবী কারও প্রতিকৃতি আঁকতেই হয়, তাহলে আসামের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব—যেমন পরেশ বড়ুয়া বা প্রয়াত সাংবাদিক ও সমাজকর্মী পরাগ দাসের ছবি আঁকা উচিত।

‘পরেশের আদর্শ মানি না, কিন্তু তিনি আসামের বিপ্লবী’

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরেশ বড়ুয়ার আদর্শ সমর্থন করেন না এবং তাঁর কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেন। তবে যদি ‘বিপ্লবী’ পরিচয়ে কাউকে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে আসামের নিজস্ব ইতিহাসের ব্যক্তিদেরই তুলে ধরা উচিত।

হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, তিনি হয়তো পরেশ বড়ুয়ার আদর্শ গ্রহণ করবেন না কিংবা তাঁর নিন্দা করবেন, কিন্তু কেউ যদি বিপ্লবীর প্রতিকৃতি আঁকতে চান, তাহলে একজন অসমিয়া বিপ্লবীর ছবিই আঁকা অধিক উপযুক্ত।

উলফা ও পরেশ বড়ুয়ার পটভূমি

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত উলফা (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম) আসামকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। আশির দশক থেকে সংগঠনটি ভারতের অন্যতম শক্তিশালী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

এই আন্দোলনের সময় বহু সহিংস ঘটনা, প্রাণহানি ও নিরাপত্তা অভিযান সংঘটিত হয়। পরে সংগঠনের একটি অংশ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও আসাম সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসে।

তবে পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন উলফার স্বাধীনপন্থী অংশ—উলফা (ইনডিপেনডেন্ট) বা উলফা-আই—সেই শান্তি প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এই গোষ্ঠী এখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পরেশ বড়ুয়া ভারতের বাইরে অবস্থান করে সংগঠন পরিচালনা করছেন বলে ধারণা করা হয়।

কেন এই মন্তব্য, উঠছে নানা প্রশ্ন

ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে পরেশ বড়ুয়া এখনো একজন পলাতক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা। ফলে তাঁকে প্রকাশ্যে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর ছবি আঁকার পরামর্শ দেওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশ্বশর্মা নিজে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। ফলে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

‘অসমিয়া জাতীয়তাবাদ’ সামনে আনার কৌশল?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আসামের এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন, মুখ্যমন্ত্রী সম্ভবত অসমিয়া জাতীয়তাবাদের প্রতীক ব্যক্তিত্বদের নতুন করে সামনে আনতে চাইছেন।

তিনি বলেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব জাতীয়তাবাদী পরিচয় রয়েছে—যেমন তামিল জাতীয়তাবাদ। সেই ধারাবাহিকতায় আসামের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ভারতের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেই নতুনভাবে তুলে ধরার একটি কৌশল হতে পারে এই বক্তব্য।

তাঁর মতে, পরেশ বড়ুয়া একদিকে আসামি জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, অন্যদিকে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনেরও নেতা। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।

বিশ্লেষকের ভাষায়, সামান্য ভুল ব্যাখ্যাও নতুন বিতর্ক বা রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। তাই আগামী দিনে এই বিষয়টিকে মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেন, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

শিল্পীকে নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা অভিযোগ করেন, জুবিন গার্গের দেয়ালচিত্রের শিল্পী মার্শাল বড়ুয়া ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-এর ছাত্রসংগঠন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই)–এর সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দাবি, সে কারণেই জুবিন গার্গকে চে গুয়েভারার আদলে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে শিল্পী মার্শাল বড়ুয়া এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই এবং তিনি কেবল একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে কাজ করেন।

জুবিন গার্গের প্রতিকৃতি ব্যবহারে নতুন নীতির ইঙ্গিত

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ভবিষ্যতে শিল্পীরা যাতে জুবিন গার্গের প্রতিকৃতি আঁকতে গেলে একটি নির্দিষ্ট অনুমোদিত ছবি অনুসরণ করেন, সে ধরনের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, জুবিন গার্গের স্ত্রী গরিমা শইকিয়া গার্গ এ বিষয়ে অনুমোদিত প্রতিকৃতি নির্ধারণ করতে পারেন।

উল্লেখ্য, গত জুন মাসে গুয়াহাটির গণেশগুড়ি উড়ালপুলে আঁকা জুবিন গার্গের মূল দেয়ালচিত্র রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুছে ফেলা হয়েছিল। সে সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য আসাম সফরকে সামনে রেখে এলাকা সংস্কারের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই সফর হয়নি।

ছবিটি মুছে ফেলার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে শিল্পী মার্শাল বড়ুয়া একই স্থানে পরে জুবিন গার্গের আরেকটি নতুন দেয়ালচিত্র অঙ্কন করেন। তবে সেই ঘটনাকে ঘিরেই এবার উলফা প্রধান পরেশ বড়ুয়ার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স