ঢাকা

আইসিসি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ বাদীরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দেশটির দুটি মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠন। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কর্মকর্তা, ফিলিস্তিনি অধিকার সংগঠন এবং জাতিসংঘের একজন বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই লক্ষ্যবস্তু করেনি; বরং তা মার্কিন নাগরিকদের সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনার অধিকারও ক্ষুণ্ন করছে।

বুধবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের জারি করা বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞাগুলো ফিলিস্তিন–সম্পর্কিত মানবাধিকার কার্যক্রমের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও আইসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক পেশাগত যোগাযোগ বজায় রাখতে ভয় পাচ্ছেন এবং সংবিধান-সুরক্ষিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

মামলাটি করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ডেমোক্রেসি ইন দ্য আরব ওয়ার্ল্ড নাও (ডন) এবং নিউইয়র্কভিত্তিক ট্যাক্সপেয়ার অ্যালায়েন্স এগেইনস্ট জেনোসাইড।

‘রাজনৈতিক মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে নিষেধাজ্ঞার অপব্যবহার’

ডনের নির্বাহী পরিচালক ওমর শাকির বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে এমন একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যার উদ্দেশ্য শুধু মানবাধিকারকর্মীদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং লাখো মার্কিন নাগরিকের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা।

তাঁর ভাষায়, প্রশাসনের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর জন্য এক ধরনের ভয়ভীতি সৃষ্টি করেছে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বা সহযোগিতা করতে নিরুৎসাহিত হয়।

আইসিসির সঙ্গে কাজ করায় ঝুঁকিতে সংগঠনগুলো

৪৩ পৃষ্ঠার মামলার নথিতে বলা হয়েছে, বাদী দুই সংগঠন অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় সংঘটিত সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর কাজে যুক্ত ছিল।

এ ছাড়া তারা গবেষণা প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে লবিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনটি ফিলিস্তিনি এনজিও ও জাতিসংঘের বিশেষ দূত (স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার) ফ্রান্সেসকা আলবানিজের সঙ্গেও কাজ করেছে।

মামলায় দাবি করা হয়েছে, এসব কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আওতায় সুরক্ষিত বাক্‌স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব কাজ চালিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা কিংবা বড় অঙ্কের দেওয়ানি জরিমানার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

রুবিওর মন্তব্যের পর নতুন আইনি লড়াই

মামলাটি এমন এক সময়ে করা হলো, যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আইসিসির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যকারিতা বিলীন করার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

আইনবিশেষজ্ঞদের সমর্থন

যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন আইনবিশেষজ্ঞ মামলাটির সাংবিধানিক ভিত্তিকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী আকিলা রাধাকৃষ্ণান।

তিনি জানান, আইসিসিকে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অভিযোগ বিষয়ে আইনি পরামর্শ দেওয়ার কাজ তাঁকে বন্ধ করতে হয়েছে। একই কারণে তিনি গত বছরও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।

আকিলার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা দুর্বল করে দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ

মেইন অঙ্গরাজ্যে চলমান আরেকটি মামলার মতোই নিউইয়র্কের এই মামলায়ও অভিযোগ করা হয়েছে, আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আইইইপিএ)–এর আওতায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে।

আইনটিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, অবাণিজ্যিক ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা মতবিনিময় নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে। অথচ বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কার্যত সেই অধিকারকেই সীমিত করছে বলে দাবি বাদীপক্ষের।

মামলায় আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, আদালত যদি এই পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো প্রেসিডেন্ট একই আইন ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিরোধী, মানবাধিকারকর্মী কিংবা পরিবেশবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারেন।

বাদীপক্ষ উদাহরণ দিয়ে বলেছে, ভবিষ্যতে কোনো প্রেসিডেন্ট জাতীয় জরুরি অবস্থার অজুহাতে বিদেশি পরিবেশবাদী সংগঠনের সঙ্গে মার্কিন জলবায়ুকর্মীদের যোগাযোগও নিষিদ্ধ করতে পারেন। এতে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহারের নজির তৈরি হবে।

যাঁদের বিবাদী করা হয়েছে

মামলায় বিবাদী হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প,
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও,
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট,
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এবং
যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি)–এর পরিচালক ব্র্যাড স্মিথকে।
মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ বলেন, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও জাতিগত নিধনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে ট্রাম্প প্রশাসন অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছে।

তাঁর মতে, শুধু আইসিসির ওপর চাপ সৃষ্টি করাই নয়, বরং সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক মার্কিন নাগরিক ও মানবাধিকারকর্মীদেরও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার পাশাপাশি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করার এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স