বিশ্বের অনেক দেশেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব বেশি। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক জনমত নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার–এর সর্বশেষ জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০০২ সালে এ ধরনের জরিপ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি জনসমর্থন ও ইতিবাচক ধারণা এগিয়ে গেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে দেখা যায়, একদিকে অনেক দেশে চীনের ভাবমূর্তি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুই পরাশক্তির ভিন্নধর্মী ভূমিকা এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৩৬ দেশের ৪২ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে জরিপ
পিউ রিসার্চ সেন্টার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত বিশ্বের ৩৬টি দেশের প্রায় ৪২ হাজার মানুষের মতামত নিয়ে এ জরিপ পরিচালনা করে। এতে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামগ্রিক ভাবমূর্তি, দুই দেশের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে ভূমিকা সম্পর্কে মতামত নেওয়া হয়।
জরিপ পরিচালনাকারী গবেষকদের একজন জনাথন শুলম্যান বলেন, ২০০২ সাল থেকে পিউ রিসার্চ সেন্টার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ঘিরে বৈশ্বিক জনমত পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এবারই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।
তিনি জানান, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা কমেছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের শেষ দিকে এবং ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে তখনও চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কিছুটা কম ছিল। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
মাত্র ছয় দেশে এখনো যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে
জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে মাত্র ছয়টি দেশে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব চীনের তুলনায় বেশি রয়েছে।
দেশগুলো হলো—
পোল্যান্ড
ফিলিপাইন
দক্ষিণ কোরিয়া
ভারত
জাপান
ইসরায়েল
এগুলোর বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে পরিচিত।
যেসব দেশে চীনের ভাবমূর্তি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে
সর্বশেষ জরিপে কয়েকটি দেশে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবে উল্লেখযোগ্য উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
স্পেন
ইতালি
গ্রিস
কানাডা
ইন্দোনেশিয়া
এ ছাড়া ইতালি, স্পেন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া এবং তুরস্কে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
পৃথক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জরিপে অন্তর্ভুক্ত ২০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা কমেছে, বিপরীতে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব বেড়েছে। একই সঙ্গে জরিপে অন্তর্ভুক্ত এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের গ্রহণযোগ্যতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনের জনপ্রিয়তা বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণভাবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলক বেশি।
অন্যদিকে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর জনগণ এখনো চীনকে তুলনামূলক নেতিবাচকভাবে দেখেন। তবে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব অনেক বেশি।
পাকিস্তানে চীনের প্রতি সর্বোচ্চ সমর্থন, জাপানে সর্বনিম্ন
জরিপ অনুযায়ী, চীন সম্পর্কে সবচেয়ে ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে পাকিস্তানে।
সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনের প্রতি ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে চীনের প্রতি সবচেয়ে কম ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে জাপানে, যেখানে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।
গবেষকদের মতে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে ঘিরে মতামতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। একই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কোথাও চীনের জনপ্রিয়তা অত্যন্ত বেশি, আবার কোথাও তা খুবই কম।
ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের প্রতি আস্থার চিত্র
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর কতটা আস্থা রাখেন।
ফলাফলে দেখা যায়, দুই নেতার প্রতিই বৈশ্বিকভাবে আস্থার মাত্রা খুব বেশি নয়। অধিকাংশ দেশেই তাঁদের প্রতি আস্থার হার ৫০ শতাংশের নিচে।
তবে বেশির ভাগ দেশে ট্রাম্পের তুলনায় সি চিন পিংয়ের প্রতি আস্থা কিছুটা বেশি দেখা গেছে।
সি চিন পিংয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের মানুষ। সেখানে তাঁর প্রতি আস্থার হার ৮৩ শতাংশ।
অন্যদিকে তাঁর প্রতি সবচেয়ে কম আস্থা পাওয়া গেছে জাপানে, যেখানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ তাঁর ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আস্থা দেখা গেছে ফিলিপাইনে, যেখানে তাঁর প্রতি আস্থা ৬৮ শতাংশ।
সবচেয়ে কম আস্থা প্রকাশ করা হয়েছে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে, যেখানে ট্রাম্পের প্রতি আস্থা মাত্র ৪ শতাংশ।
ব্যক্তিস্বাধীনতায় এখনো এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র
জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এখনো যুক্তরাষ্ট্র চীনের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এ ক্ষেত্রে দুই দেশের ব্যবধান আগের তুলনায় কমে এসেছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রশ্নে চীনের অবস্থানকে তুলনামূলক ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
মধ্যম আয়ের কয়েকটি দেশে পরিচালিত পৃথক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। একই প্রশ্নে চীনের ক্ষেত্রে এই মত দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ জরিপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশে চীনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের হ্রাস বৈশ্বিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করছে।
গবেষকদের মতে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনের সক্রিয় ভূমিকা অনেক দেশের জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি, আন্তর্জাতিক সংঘাতে ভূমিকা এবং বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিয়েও বিভিন্ন দেশে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই জরিপের ফলাফলে।