বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর করার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতির আওতায় বিশেষ সরকারি অনুমতি ছাড়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা চার বছরের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারবেন না। পাশাপাশি পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর দেশ ছাড়তে বা অন্য ধরনের ভিসায় রূপান্তরের জন্য সময় কমিয়ে ৬০ দিনের পরিবর্তে ৩০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে নতুন বিধান কার্যকর হবে। সরকারের ভাষ্য, ভিসার অপব্যবহার রোধ, অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর একটি ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করবে নতুন বিধান এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
চার বছরের বেশি থাকতে লাগবে বিশেষ অনুমতি
বর্তমানে এফ-১ (F-1) শিক্ষার্থী ভিসা এবং জে-১ (J-1) এক্সচেঞ্জ ভিসাধারীরা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ (Duration of Status) নীতির আওতায় তাঁদের একাডেমিক কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থান করতে পারেন। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট মেয়াদের পরিবর্তে তাঁদের ভিসার বৈধতা নির্ভর করে পড়াশোনার সময়সীমার ওপর।
কিন্তু নতুন নিয়মে এই ব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে।
এখন থেকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। সাধারণভাবে চার বছরের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে চাইলে ফেডারেল সরকারের বিশেষ অনুমোদন নিতে হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পিএইচডি বা অন্যান্য উচ্চশিক্ষা কর্মসূচিতে অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থী নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয় বদল ও কোর্স পরিবর্তনেও কড়াকড়ি
নতুন নীতিতে শুধু অবস্থানের সময়সীমাই নয়, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর কিংবা একাডেমিক প্রোগ্রাম পরিবর্তনের সুযোগ আগের তুলনায় সীমিত করা হবে।
এতদিন এসব বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল। শিক্ষার্থীর একাডেমিক অগ্রগতি বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই অনেক ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারত। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে সেই প্রক্রিয়ায় ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে।
পড়াশোনা শেষে দেশ ছাড়তে সময় অর্ধেকে নামল
নতুন বিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সময়সীমা কমিয়ে দেওয়া।
বর্তমানে শিক্ষাক্রম শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা ৬০ দিনের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ পান। এই সময়ে তাঁরা হয় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে পারেন, নয়তো অন্য কোনো বৈধ ভিসা ক্যাটাগরিতে পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন।
কিন্তু সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী এই সময়সীমা কমিয়ে মাত্র ৩০ দিন করা হবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে চাকরি, উচ্চশিক্ষা কিংবা ভিসা পরিবর্তনের পরিকল্পনা থাকা অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বাড়তি চাপের মুখে পড়বেন।
সরকারের ব্যাখ্যা
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনির্দিষ্ট সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং অনেকেই সেই সুযোগের অপব্যবহার করেছেন।
তাঁর ভাষায়, বহু শিক্ষার্থী একের পর এক কোর্সে ভর্তি হয়ে বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গেছেন, যা অভিবাসন ব্যবস্থার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সরকারের দাবি, নতুন নীতির মাধ্যমে নিয়মিত যাচাই-বাছাই নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার কমবে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাবের আশঙ্কা
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ স্নাতক (ব্যাচেলর) ডিগ্রি সাধারণত চার বছরে শেষ হয়, তবে স্নাতকোত্তর, পিএইচডি এবং গবেষণাভিত্তিক অনেক কর্মসূচি শেষ করতে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) বিষয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পরীক্ষাগারভিত্তিক কাজ, গবেষণাপত্র প্রকাশ কিংবা অর্থায়নের জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশঙ্কা, নতুন নিয়ম গবেষণার ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আকর্ষণ কমিয়ে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংগঠনের সমালোচনা
অলাভজনক আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেটরস (নাফসা) নতুন নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ফান্টা আও বলেন, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর একটি ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
তাঁর মতে, সরকার এমন একটি সমস্যার সমাধান করতে চাইছে, যার বাস্তব অস্তিত্বের পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
নাফসার আশঙ্কা, নতুন বিধান যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতায় দেশটির অবস্থান দুর্বল করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির অংশ
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই ভিসানীতি ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতিরই ধারাবাহিকতা।
এর আগে প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেছেন—এমন কিছু বিদেশি শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিলের পদক্ষেপও আলোচনায় আসে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি, গবেষণা কার্যক্রম এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ফেডারেল সরকারের নজরদারিও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে ইচ্ছুক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা পরিকল্পনা, কোর্স নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় আরও সতর্ক হতে হবে।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পিএইচডি, পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষা কিংবা ভিসা পরিবর্তনের পরিকল্পনা থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সময়সীমা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দাবি, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব হবে। তবে নতুন নীতির ফলে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং বৈশ্বিক শিক্ষার্থী চলাচলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।