কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকা তৈরি এবং মাতৃত্বকালীন ও অসুস্থতাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীদের অন্যায্যভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করেছেন ২৬ জন বর্তমান ও সাবেক কর্মী। তাঁদের অভিযোগ, কোম্পানির এআইভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা বৈধ ছুটিতে থাকা কর্মীদের কম স্কোর দিয়ে ছাঁটাইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় জেলা ফেডারেল আদালতে দায়ের করা ৭১ পৃষ্ঠার মামলায় এই অভিযোগ আনা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা চলতি বছরের শুরুতে যে কর্মী ছাঁটাই কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেখানে এআইনির্ভর বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছিল।
‘মানুষ নয়, এআই করেছে বাছাই’
মামলার বাদীদের অভিযোগ, কর্মীদের সরাসরি তত্ত্বাবধানকারী ব্যবস্থাপকদের মূল্যায়নের পরিবর্তে মেটা এআইভিত্তিক স্কোরিং, র্যাঙ্কিং এবং কর্মক্ষমতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছাঁটাইয়ের জন্য কর্মীদের নির্বাচন করেছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের কিবোর্ড ব্যবহার, কম্পিউটারে সক্রিয় থাকার সময়, উৎপাদনশীলতার তথ্য এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে একটি এআইভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই কর্মীদের স্কোর নির্ধারণ এবং ছাঁটাইয়ের তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
বাদীদের দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রকৃত কাজের মান, দায়িত্ব বা বাস্তব কর্মদক্ষতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
মাতৃত্বকালীন ও অসুস্থতার ছুটি হয়ে ওঠে ‘ঝুঁকি’
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, এআইভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা বৈধভাবে ছুটিতে থাকা কর্মীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে।
বাদীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসাজনিত ছুটি কিংবা শারীরিক অক্ষমতার কারণে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে এআই সিস্টেমে তাঁদের কাজের তথ্য স্বাভাবিকভাবে জমা হয়নি। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের কর্মক্ষমতার স্কোর কমে যায় এবং তাঁরা ছাঁটাইয়ের উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ে যান।
মামলায় বলা হয়েছে, ছুটিতে থাকার বিষয়টিকে মূল্যায়ন ব্যবস্থা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা তো করেইনি, বরং আইনগতভাবে স্বীকৃত ছুটি নেওয়ার কারণে কার্যত কর্মীদের শাস্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাদীদের অভিজ্ঞতা
মামলার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে।
এক নারী বিজ্ঞানী জানান, সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্র দুই দিন আগে তিনি চাকরি হারানোর নোটিশ পান। তখন তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন।
আরেকজন প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাজনিত ছুটি নেওয়ার পর তাঁর কর্মক্ষমতার রেটিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরবর্তীতে তাকেও ছাঁটাইয়ের তালিকায় রাখা হয়।
অন্যদিকে একজন ব্যবস্থাপক জানান, অসুস্থতাজনিত ছুটি শুরু হওয়ার মাত্র ১৬ দিনের মাথায় তাঁকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
আদালতের কাছে কী চেয়েছেন বাদীরা
বাদীরা আদালতের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা (ইনজাংশন) চেয়েছেন, যাতে ছাঁটাই কার্যক্রম চূড়ান্ত হওয়ার আগেই তা স্থগিত করা হয়।
এ ছাড়া তাঁরা চাকরিতে পুনর্বহাল, বকেয়া বেতন, হারানো সুযোগ-সুবিধা, ক্ষতিপূরণ এবং কর্মসংস্থানের অন্যান্য সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়ারও আবেদন জানিয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবীরা আরও দাবি করেছেন, মেটার ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থার একটি স্বাধীন নিরীক্ষা (ইন্ডিপেনডেন্ট অডিট) করা হোক। তাঁদের মতে, নিরীক্ষা হলে স্পষ্ট হবে কীভাবে ২৬ জন কর্মীকে ছাঁটাইয়ের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল।
মেটার অস্বীকৃতি
তবে মেটা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক ই-মেইল বিবৃতিতে কোম্পানির এক মুখপাত্র বলেন, "মামলায় উত্থাপিত অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং এতে বর্ণিত দাবিগুলো সত্য নয়।"
তিনি আরও বলেন, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত মানুষের মাধ্যমেই নেওয়া হয়েছে, কোনো এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়নি।
নজরদারিতে এআই ব্যবহারের অভিযোগ
মামলায় আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে মেটা কর্মীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সফটওয়্যার কর্মীরা কম্পিউটারে কোন কী চাপছেন, মাউস কীভাবে ব্যবহার করছেন, কোন ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহার করছেন—এসব তথ্য সংগ্রহ করত। পাশাপাশি অফিসের ডিভাইস থেকে পাঠানো ই-মেইল, বার্তা এবং ব্যবহারকারীর অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যও পর্যবেক্ষণ করতে পারত।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, কর্মীদের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়াই গোপনে এই নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। বিষয়টি জানানো হয়েছিল একটি সাধারণ অভ্যন্তরীণ পোস্টের মাধ্যমে, যেখানে অনেক কর্মীকে আগাম অবহিতই করা হয়নি। এমনকি শুরুতে এই নজরদারি ব্যবস্থা থেকে নিজেকে বাদ দেওয়ার (অপট-আউট) সুযোগও ছিল না।
জাকারবার্গের বক্তব্য
মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ এর আগে জানিয়েছিলেন, কোম্পানির এআই মডেল উন্নত করার উদ্দেশ্যেই কর্মীদের কাজের ধরন বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনফরমেশন–এর তথ্য অনুযায়ী, একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠকে তিনি বলেন, মেটার এআই মডেলগুলো দক্ষ কর্মীদের কাজ পর্যবেক্ষণ করে আরও উন্নতভাবে শেখে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, কোম্পানির কর্মীদের গড় দক্ষতা ও মেধার মান অত্যন্ত উচ্চ এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এআই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
কর্মীদের প্রতিবাদে প্রকল্প স্থগিত
মেটার এই নজরদারি প্রকল্প ঘিরে গত কয়েক মাসে কোম্পানির ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
কর্মীদের অভিযোগ ছিল, এই ব্যবস্থা তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে এবং কর্মপরিবেশে অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি করছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুন মাসে মার্ক জাকারবার্গ প্রকল্পটি সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেন। এর আগে কোম্পানির ১ হাজার ৬০০-এর বেশি কর্মী গণস্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পটির বিরোধিতা করেছিলেন।
কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে বাড়ছে আইনি নজরদারি
এই মামলাকে কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মূল্যায়ন, নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ফলে পক্ষপাত, বৈষম্য, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ইলিনয়সহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে কর্মসংস্থানে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং বৈষম্য প্রতিরোধে নতুন আইন ও বিধিমালা কার্যকর হয়েছে।
২২ জুলাইয়ের আগে আইনি সুরক্ষার আবেদন
বাদীপক্ষের আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, মামলায় যুক্ত কর্মীরা আগামী ২২ জুলাই পর্যন্ত মেটার তালিকাভুক্ত কর্মী হিসেবে বহাল থাকবেন। এরপর তাঁদের চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
এ কারণে আদালতের কাছে তাঁরা দ্রুত অন্তর্বর্তী আদেশ চেয়েছেন, যাতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ছাঁটাই কার্যকর না হয় এবং কোম্পানি কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারে। পাশাপাশি বাদীদের পরিচয় গোপন রাখারও আবেদন করা হয়েছে।
আইনজীবীদের ভাষ্য, একবার ছাঁটাই কার্যকর হয়ে গেলে সেই ক্ষতি সহজে পূরণ করা সম্ভব হবে না। এতে কর্মীরা স্বাস্থ্যবিমা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, শেয়ারভিত্তিক পারিশ্রমিক, চাকরিসংক্রান্ত অন্যান্য অধিকার এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
এই মামলার রায় ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে এআইনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা, স্বচ্ছতা এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি ও শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা।