ঢাকা

প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে এলো নতুন বিধান, বদলি কমিটিতে বড় পরিবর্তন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় সমালোচনার মুখে নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বদলি কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধান বাতিল করে তার পরিবর্তে ‘বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে সাতটি নতুন শর্ত সংযোজন করা হয়েছে, যা বদলি প্রক্রিয়াকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ করার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।

সংশোধিত নীতিমালার তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। নতুন বিধান অনুযায়ী, শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয়—এই চার স্তরের কমিটি বহাল থাকলেও তাদের গঠন ও কার্যপ্রণালায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সমালোচনার পর নীতিমালায় সংশোধন

গত ২১ জুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়নের জন্য নতুন পদ্ধতি চালু করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই নীতিমালায় অনলাইন পদ্ধতির পরিবর্তে প্রচলিত বা সনাতন ব্যবস্থায় আবেদন গ্রহণ এবং চার স্তরের কমিটির মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রাখা হয়।

তবে নীতিমালার একটি বিষয় নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসন ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। কারণ উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বদলি কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন করে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ সদস্য রাখার বিধান ছিল।

সমালোচকদের মতে, নীতিমালায় ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সরকারি শিক্ষকদের বদলির মতো একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বাইরের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করলে স্বচ্ছতার পরিবর্তে তদবির, প্রভাব বিস্তার ও অযাচিত হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

যদিও আগের নীতিমালায় জাতীয় পর্যায়ের কমিটিতে এ ধরনের কোনো সদস্য রাখা হয়নি, তবু উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কমিটিতে এই বিধান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’র পরিবর্তে থাকবেন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি

সমালোচনার পর গত বৃহস্পতিবার নীতিমালায় সংশোধন আনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বদলি কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন সদস্য থাকবেন, তবে তাঁদের পরিচয় হবে ‘বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি’। অর্থাৎ ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ শব্দবন্ধটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিভাগীয় কমিটির সভাপতি থাকবেন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা কমিটির সভাপতি হবেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা বা থানা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।

জাতীয় কমিটির নেতৃত্বেও পরিবর্তন

শুধু আঞ্চলিক কমিটিতেই নয়, জাতীয় পর্যায়ের বদলি কমিটির গঠনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আগের নীতিমালায় জাতীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবকে। তবে সংশোধিত নীতিমালায় সেই পরিবর্তন এনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (ডিজি) জাতীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।

এ ছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিদ্যালয়) এবং সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি অ্যান্ড অপারেশন)।

বদলির ক্ষেত্রে যুক্ত হলো সাতটি নতুন শর্ত

আগের নীতিমালায় বদলির আবেদন করার যোগ্যতা বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো শর্ত ছিল না। সেখানে শুধু বলা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো প্রতি মাসে অন্তত একবার সভা করে বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবে।

একই উপজেলা, জেলা বা বিভাগের মধ্যে বদলির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে আদেশ জারি করা হবে। আর আন্তবিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন এলাকার বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই করবে জাতীয় কমিটি। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে পদায়নের দায়িত্বও জেলা কমিটির ওপরই থাকবে।

তবে সংশোধিত নীতিমালায় এসব বিধান বহাল রেখে সাতটি নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

১. ন্যূনতম দুই বছর চাকরি না হলে বদলি নয়

কোনো সহকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকা চাকরিতে যোগদানের পর কমপক্ষে দুই বছর পূর্ণ না হলে বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। একইভাবে একবার বদলি হওয়ার পর তিন বছর পূর্ণ না হলে পুনরায় বদলির জন্য বিবেচিত হবেন না।

২. শুধু শূন্য পদের বিপরীতে বদলি

যে বিদ্যালয়ে শূন্য পদ থাকবে, শুধুমাত্র সেই পদের বিপরীতেই শিক্ষক বদলি করা যাবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত শিক্ষক থাকা বা শূন্য পদ না থাকলে সেখানে বদলি দেওয়া যাবে না।

৩. আবেদন ছাড়া বদলি নয়

কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকার লিখিত আবেদন ছাড়া তাঁকে নিজ বিদ্যালয় থেকে অন্যত্র বদলি করা যাবে না। তবে জনস্বার্থ বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে জাতীয় কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে বদলি করা সম্ভব হবে।

৪. শিক্ষকসংকট রয়েছে এমন বিদ্যালয় থেকে বদলি নিষিদ্ধ

যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত আছেন অথবা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এর বেশি, সেসব বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষককে বদলি করা যাবে না। এর মাধ্যমে শিক্ষকসংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা কমাতে চায় সরকার।

৫. একাধিক আবেদন হলে জ্যেষ্ঠদের অগ্রাধিকার

একই বিদ্যালয় থেকে একাধিক শিক্ষক বদলির আবেদন করলে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

৬. সংযুক্তি পদায়নে সীমা নির্ধারণ

একটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ তিনজন শিক্ষককে সংযুক্তি পদায়ন করা যাবে। এর বেশি সংযুক্তি অনুমোদন দেওয়া হবে না।

৭. নারী শিক্ষকদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার

সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নিজের স্থায়ী ঠিকানা অথবা স্বামীর ঠিকানার নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে বদলির আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।

স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্য

শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে বদলি প্রক্রিয়ায় বিতর্কিত বিষয়গুলো দূর করার পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অগ্রাধিকারভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষ করে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি’ অন্তর্ভুক্ত করা এবং বদলির জন্য নির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করায় প্রক্রিয়াটি আরও সুসংগঠিত ও জবাবদিহিমূলক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে শিক্ষকসংকটপূর্ণ বিদ্যালয় থেকে নির্বিচারে বদলি বন্ধ হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাসেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স