ঢাকা

‘জুলাইয়ের চেতনা’কে রাজনৈতিক-ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করার আহ্বান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
‘জুলাই কারও একার সম্পদ নয়। জুলাইয়ের চেতনা দিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা করা যাবে না।’—এমন মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শুধু রাজনৈতিক স্লোগান বা আন্দোলনের চেতনার ওপর ভর করে দীর্ঘদিন রাজনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে, তাদের জনগণের সামনে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা এবং সংস্কারের রূপরেখা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

রোববার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের শরিক গণ অধিকার পরিষদ (জিওপি) এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

‘জুলাই সবার, কারও একার নয়’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের একক অর্জন নয়। এটি ছিল দেশের মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন। তাই এই আন্দোলনের চেতনাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে এর মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, “জুলাই কারও একার সম্পদ নয়। এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে এর মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”

‘শুধু স্লোগান নয়, জনগণ জানতে চায় পরিকল্পনা’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যারা জুলাইয়ের চেতনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল বা সংগঠন গঠন করেছে, তাদের শুধু আন্দোলনের কথা বললেই চলবে না; বরং দেশের মানুষের সামনে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ, কর্মপরিকল্পনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা স্পষ্ট করতে হবে।

তিনি বলেন, “শুধু জুলাইয়ের চেতনার কথা বললেই হবে না। নতুন রাজনীতির রূপরেখা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে।”

তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্লোগান বা আবেগ দিয়ে সাময়িকভাবে জনসমর্থন পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সুস্পষ্ট নীতি ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।

‘নতুন বন্দোবস্ত’ বলতে কী বোঝায়, তা ব্যাখ্যা করতে হবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বা ‘দায় ও দরদের রাজনীতি’—এ ধরনের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এসব শব্দগুচ্ছের বাস্তব অর্থ জনগণের কাছে পরিষ্কার নয়।

তিনি বলেন, এসব ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্র, নির্বাচন, জবাবদিহি, সুশাসন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা জনগণের সামনে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

তাঁর ভাষায়, শুধু নতুন শব্দ বা স্লোগান ব্যবহার করলেই বিকল্প রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং সেই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

জামায়াত ও এনসিপিকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য

বক্তব্যের একপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে না থাকার অভিযোগ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, “যারা সাতচল্লিশের চেতনার কথা বলে, তাদের কাছে গেলে তো অসুবিধা। আমি সংসদে বলেছিলাম, আপনারা তো সাতচল্লিশেও পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না। একাত্তরে তো ছিলেনই না। এখন দয়া করে চব্বিশে থাকেন। তাহলে জনগণ উপকৃত হবে। সব সময় স্রোতের বিপরীতে, জনগণের চাহিদার বিপরীতে বক্তব্য দিয়ে এ দেশের মানুষকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না।”

‘জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়, এমন বক্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সেই মতবিরোধ যেন ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য বজায় রাখা গেলে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুনরুত্থান ঠেকানো সহজ হবে।

সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা

দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি জানান, এ ধরনের সংস্কারের ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে।

তাঁর মতে, টেকসই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই।

‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি বলেন, এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐকমত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদের বক্তব্য

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ জোটের অন্য নেতারা। বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তাৎপর্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স