পাঁচ ঘণ্টার টানা আক্রমণে নিহত অন্তত ১, আহত ৭; আবাসিক ভবন, ছাত্রাবাস ও মেট্রোস্টেশনে ক্ষয়ক্ষতি, পাল্টা হামলার দাবি ইউক্রেন
রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে যুদ্ধ শুরুর পর অন্যতম বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা এ হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। হামলায় আবাসিক ভবন, ছাত্রাবাস, অফিস ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং উদ্ধারকর্মীদের রাতভর উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় রাশিয়া প্রায় ৪০টি ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জিরকন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে ড্রোন হামলাও চালানো হয়। কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও অধিকাংশ ড্রোন ভূপাতিত করলেও সব হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।
পাঁচ ঘণ্টার টানা হামলায় কেঁপে ওঠে কিয়েভ
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, স্থানীয় সময় শনিবার দিবাগত রাত প্রায় দেড়টার দিকে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজধানীর আকাশে সক্রিয় হয়ে ওঠে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে কয়েক মিনিট পরই একের পর এক বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে কিয়েভ।
পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ঐতিহাসিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবন কেঁপে ওঠে এবং বিস্ফোরণের অভিঘাতে রাস্তায় থাকা অসংখ্য গাড়ির অ্যালার্ম একযোগে বেজে ওঠে।
সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে দ্বিতীয় দফায় আবারও বিমান হামলার সতর্কসংকেত জারি করা হয়। এ সময়ও নতুন করে হামলার খবর পাওয়া যায়।
আবাসিক ভবন ও ছাত্রাবাসে আগুন
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিয়েভের কেন্দ্রীয় শেভচেঙ্কিভস্কি জেলা। সেখানে একটি তিনতলা ভবনে আগুন ধরে যায়। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। একই ভবন থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া রাজধানীর আরও অন্তত চারটি এলাকায় হামলার কারণে আবাসিক ভবন, অফিস এবং একটি ছাত্রাবাসে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা একাধিক স্থানে একযোগে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।
মেট্রোস্টেশনের ছাদ ধসে পড়ে
হামলার প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কিয়েভের লুকিয়ানিভস্কা মেট্রোস্টেশনের নিচতলার প্রবেশপথের ছাদ আংশিক ধসে পড়ে।
হামলার সময় স্টেশনটির ভেতরে বহু মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে স্টেশনটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
হতাহত ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাবি
কিয়েভের সামরিক প্রশাসন টেলিগ্রামে জানায়, প্রাথমিক হিসেবে হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানান, সাতজন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর দাবি, রাশিয়ার ছোড়া প্রায় ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ভূপাতিত করা হয়েছে। পাশাপাশি হামলায় ব্যবহৃত ১২৫টি ড্রোনের মধ্যে ১০৮টিই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তাদের মতে, হামলার প্রধান লক্ষ্যই ছিল রাজধানী কিয়েভ।
বাসিন্দাদের আতঙ্ক
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিম কিয়েভের একটি আবাসিক এলাকায় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ধ্বংসস্তূপে রাতভর তল্লাশি চালান জরুরি পরিষেবার সদস্যরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ভ্লাদ রয়টার্সকে বলেন, বিস্ফোরণের সময় তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে বারান্দার দরজা ভেঙে তাঁর মাথায় এসে পড়ে।
তিনি বলেন,
"আমার দাদি আমার সঙ্গে থাকেন। তিনি হাঁটতে পারেন না। তাঁকে ফেলে আমি কীভাবে পালাব?"
এ ছাড়া সলোমিয়ানস্কি, দেসনিয়ানস্কি ও দিনিপ্রো জেলাতেও একাধিক স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
আকাশ প্রতিরক্ষার সংকটে ইউক্রেন
রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছে ইউক্রেন। তাঁর আশা, চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশেই এসব ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন,
"ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেদের রক্ষা করাই এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রতিদিনই আমাদের আরও ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন।"
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে দ্রুত নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়াই এখন কিয়েভের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক লক্ষ্য।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই হামলা
রুশ হামলার সময় ইউক্রেনের রাজধানীতে আরেকটি বড় রাজনৈতিক সংকটও চলছিল।
সম্প্রতি জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে কিয়েভে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা ফেদোরভকে পুনর্বহালের পাশাপাশি সেনাপ্রধান কর্নেল জেনারেল ওলেকসান্দর সিরস্কিকে অপসারণের দাবিও জানাচ্ছেন।
এমন রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই রাজধানীতে এই বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটল।
পাল্টা হামলার দাবি ইউক্রেনের
শুধু ইউক্রেনেই নয়, রাশিয়ার ভেতরেও পাল্টা হামলার দাবি করেছে কিয়েভ।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার মস্কো ও তামবভ অঞ্চলে ড্রোন হামলা চালিয়ে দুটি বড় ই-কমার্স ও লজিস্টিক গুদাম লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে আটজন নিহত হয়েছেন এবং বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দাবি, ওই স্থাপনাগুলো রাশিয়ার ড্রোন উৎপাদন এবং নেভিগেশন সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যবহৃত হচ্ছিল। বেসামরিক অবকাঠামোতে রুশ হামলার জবাব হিসেবেই এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে রাশিয়া।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিলের পর ইউক্রেনে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস ছিল চলতি বছরের জুন। ওই মাসে অন্তত ২৯৩ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সম্মুখসমরের পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও উভয় পক্ষই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়িয়ে চলেছে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই সংঘাত দ্রুত অবসানের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।