জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকদের প্রশাসক হিসেবে বসিয়ে বিএনপি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের দাবিদার হলেও বাস্তবে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় বিএনপির পদধারীদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে দলটি সেই আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছে।
রোববার সন্ধ্যায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরের ঐতিহাসিক তেঁতুলতলায় অনুষ্ঠিত ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের দাবি, কিন্তু আচরণ ভিন্ন’
বিএনপির সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করলেও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তাদের কর্মকাণ্ড ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্য লাগে যে বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ক্রেডিট নিতে চায়; কিন্তু স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রতিনিধি বসানোর মধ্য দিয়ে তারা বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে একদলীয় শাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।”
তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
‘সব স্তরে বিএনপির পদধারীদের বসানোর চেষ্টা’
আখতার হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশের জেলা পরিষদগুলোর প্রশাসক হিসেবে বিএনপির পদধারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সিটি করপোরেশনগুলোতেও বিএনপির নেতারা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েও বিএনপির পদধারীদের প্রশাসক হিসেবে বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশের প্রতিটি স্থানীয় সরকারের কাঠামোতে তারা একদলীয় শাসন করার পাঁয়তারা করছে। গোটা বাংলাদেশে যতগুলো জেলা পরিষদ আছে, সব জেলা পরিষদের প্রশাসক বিএনপির পদধারীরা। সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক বিএনপির পদধারীরা। এখন ইউনিয়ন পর্যায়েও বিএনপির পদধারীদের প্রশাসক বানানোর পাঁয়তারা চলছে।”
‘বাংলাদেশকে সবার রাষ্ট্র হতে দিতে হবে’
বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, রাষ্ট্রকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনার চেষ্টা না করে জনগণের রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা তাদের কাছে উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানাই, এই বাংলাদেশটাকে সবার হতে দেন, এই বাংলাদেশটাকে জনগণের হতে দেন। এই বাংলাদেশকে আর আগের নিয়মে চালানো যাবে না। আবু সাঈদরা যে লক্ষ্য নিয়ে জীবন দিয়েছিলেন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের শাসনকাঠামো পরিচালনা করতে হবে।”
‘হাসিনামুক্ত বাংলাদেশ হয়েছে, কিন্তু কাঠামো বদলায়নি’
গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, আন্দোলনের সময় জনগণের দুটি প্রধান লক্ষ্য ছিল—একটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন শাসনের অবসান এবং অন্যটি সেই শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন।
তিনি বলেন, “চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশের মানুষের দুটি লক্ষ্য ছিল। এক, বাংলাদেশকে হাসিনামুক্ত করা। দুই, বাংলাদেশকে হাসিনার শাসনকাঠামোমুক্ত করা। আমরা বাংলাদেশকে হাসিনামুক্ত করতে পেরেছি, আওয়ামী লীগকে শাসনকাঠামো থেকে সরাতে পেরেছি। তারা পরাজিত হয়ে দেশ ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু যে নিয়মকানুনের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হতো, সেই কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে।”
তাঁর মতে, কেবল সরকার পরিবর্তন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না; রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাঠামোয়ও পরিবর্তন প্রয়োজন।
‘সংশোধন নয়, আমূল সংস্কার চাই’
রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থানেরও সমালোচনা করেন আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, বিএনপি সংবিধান সংশোধনের কথা বললেও এনসিপি কেবল আংশিক সংশোধনের পক্ষে নয়। বরং তারা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন চায়।
তাঁর ভাষায়, “আমরা শুধু সংবিধান সংশোধনের মধ্যে থাকতে চাইনি। আমরা এই সংবিধানের আমূল পরিবর্তন চেয়েছি। এই সংবিধানের ভিত্তিগুলোর পরিবর্তন চেয়েছি। এই সংবিধানে ফ্যাসিবাদের যত বীজ রয়েছে, সেগুলো উৎপাটন করে এটিকে গণমানুষের সংবিধানে পরিণত করতে চেয়েছি। আমরা কুসুম কুসুম সংশোধনী নয়, বিপ্লবী সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পরিবর্তন চাই।”
পদযাত্রায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণ
তেঁতুলিয়া উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পথসভায় দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
এতে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
সভায় বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, রাষ্ট্র সংস্কার, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। পাশাপাশি দলীয় কর্মসূচি সফল করতে নেতাকর্মীদের সংগঠিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।