রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে দেশ। এরই মধ্যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা এবং প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্যদের তালিকা এখন অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে।
দলীয় ও সরকারি পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, বিএনপির বাইরে থেকে কাউকে নয়, বরং দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম—জাতীয় স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সম্ভাবনা বেশি। যদিও এ বিষয়ে এখনো বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্থায়ী কমিটির সদস্যদের দিকেই নজর
সরকার গঠনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় ছিল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান।
এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নামও আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নাম নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শারীরিক সক্ষমতা, দায়িত্ব পালনের উপযোগিতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে শুরুতে যাঁদের নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছিল, তাঁদের কেউ কেউ এখন আলোচনায় পিছিয়ে পড়েছেন।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মির্জা ফখরুল
গত দুই দিনে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, বিএনপির ভেতরের একটি অংশ নানা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিবেচনায় তাঁকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে আগ্রহী। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলের সংকটকালীন নেতৃত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি—এসব কারণকে সামনে রেখে তাঁর পক্ষে মত তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি বিএনপি দলীয় নেতার মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে মির্জা ফখরুলের নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমর্থন
রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরেও মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করছেন বিভিন্ন ব্যক্তি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল নিজের ফেসবুক পোস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ‘সেরা প্রার্থী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি লিখেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তাঁকে একজন মডারেট, ভদ্র ও দক্ষ বক্তা হিসেবেও উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল।
তাঁর ভাষ্য, বিএনপিতে আরও যোগ্য ব্যক্তি থাকলেও সামগ্রিক বিবেচনায় মির্জা ফখরুলই এগিয়ে থাকবেন এবং রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত হতে পারেন।
একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন ব্র্যাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহও। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেন তাঁর দৃষ্টিতে মির্জা ফখরুল অন্যদের তুলনায় রাষ্ট্রপতি পদের জন্য অধিক উপযুক্ত।
সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী বলছে
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের মাধ্যমে শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
এখনো চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত
যদিও বিভিন্ন নাম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে, তবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে এখনো কিছুটা সময় রয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা না করা পর্যন্ত সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে। ফলে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নতুন নতুন নাম সামনে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।