গণিতকে অনেকেই সংখ্যার শুষ্ক ও কঠিন খেলা বলে মনে করেন। কিন্তু ইরানের কিংবদন্তি গণিতবিদ মরিয়ম মির্জাখানির কাছে গণিত ছিল এক বিশাল অরণ্য—যেখানে নতুন পথের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হারিয়ে থাকলেও ক্লান্তি আসত না। জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে তিনি মেঝেতে বড় বড় কাগজ বিছিয়ে রেখা, বক্ররেখা ও নানান চিত্র আঁকতেন। তাঁর ছোট্ট মেয়ে মজা করে বলত, ‘মা আবার পেইন্টিং করছে!’
এই ‘চিত্রশিল্পী’ই ছিলেন বিশ্বের গণিত অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—ইতিহাসের প্রথম নারী, যিনি গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মান ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন।
২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে (International Congress of Mathematicians) মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তাঁর নাম ফিল্ডস মেডেল বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে ১৯৩৬ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নারী এই সম্মান অর্জন করেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন প্রথম ইরানি গণিতবিদ, যিনি ফিল্ডস মেডেল লাভ করেন।
ইরানের এক মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে বিশ্বসেরা গণিতবিদ
মরিয়ম মির্জাখানির জন্ম ১৯৭৭ সালে ইরানের রাজধানী তেহরানে। ছোটবেলায় তাঁর স্বপ্ন ছিল লেখক হওয়ার। তবে স্কুলজীবনে গণিতের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (IMO) তিনি পরপর দুই বছর ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৪ সালে স্বর্ণপদক এবং ১৯৯৫ সালে পূর্ণ নম্বর পেয়ে আবারও স্বর্ণপদক অর্জন করেন। এই সাফল্য তাঁকে আন্তর্জাতিক গণিত অঙ্গনে পরিচিত করে তোলে।
পরবর্তীতে তিনি তেহরানের শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে খ্যাতিমান গণিতবিদ কার্টিস ম্যাকমুলেনের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আধুনিক জ্যামিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
গবেষণার মূল ক্ষেত্র
মরিয়ম মির্জাখানির গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল তাত্ত্বিক গণিত। বিশেষ করে তিনি রিমান সারফেস (Riemann Surfaces), হাইপারবোলিক জ্যামিতি (Hyperbolic Geometry) এবং মডুলাই স্পেস (Moduli Spaces) নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করেন।
সহজভাবে বলতে গেলে, সাধারণ সমতল জ্যামিতির বাইরে এমন সব পৃষ্ঠ রয়েছে, যেগুলো ডোনাটের মতো ছিদ্রযুক্ত বা আরও জটিল আকৃতির। এসব পৃষ্ঠে প্রচলিত জ্যামিতির নিয়ম পুরোপুরি প্রযোজ্য হয় না। এই ধরনের জটিল গাণিতিক কাঠামো বোঝার জন্য যে বিশেষ জ্যামিতি ব্যবহার করা হয়, সেটিই হাইপারবোলিক জ্যামিতি। মির্জাখানির গবেষণার বড় অংশ ছিল এমন জটিল জ্যামিতিক কাঠামোর আচরণ ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা।
যে গবেষণার জন্য ইতিহাস গড়েছিলেন
আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়ন (International Mathematical Union-IMU) তাঁর কয়েকটি যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ফিল্ডস মেডেল প্রদান করে। এসব গবেষণা আধুনিক জ্যামিতি, টপোলজি এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
১. জিওডেসিক বা সবচেয়ে ছোট পথের রহস্য উন্মোচন
সমতল নয়, বরং বাঁকানো কোনো পৃষ্ঠে দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে ছোট পথকে বলা হয় জিওডেসিক (Geodesic)।
মির্জাখানি দেখিয়েছেন, একটি হাইপারবোলিক পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের চেয়ে ছোট এবং নিজেদের সঙ্গে কখনো ছেদ না করা সরল বদ্ধ জিওডেসিকের সংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিন ধরে জ্যামিতিবিদদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল। তাঁর গবেষণা সেই সমস্যার সমাধানে নতুন তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে।
২. মডুলাই স্পেসের আয়তন নির্ণয়ের নতুন কৌশল
একই ধরনের রিমান সারফেস বিভিন্নভাবে বিকৃত বা পরিবর্তিত হতে পারে। এসব সম্ভাব্য রূপের সমষ্টিকেই বলা হয় মডুলাই স্পেস।
এই জটিল গাণিতিক কাঠামোর Weil–Petersson volume নির্ণয়ের জন্য মির্জাখানি সম্পূর্ণ নতুন একটি গাণিতিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। আধুনিক জ্যামিতিতে এটি একটি মৌলিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পরবর্তী বহু গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে।
৩. উইটেনের অনুমানের নতুন জ্যামিতিক প্রমাণ
বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেন স্ট্রিং তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি নিয়ে গবেষণার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক অনুমান উপস্থাপন করেছিলেন, যা উইটেনস কনজেকচার (Witten's Conjecture) নামে পরিচিত।
মির্জাখানি তাঁর উদ্ভাবিত কৌশল ব্যবহার করে মডুলাই স্পেসের আয়তনের একটি পুনরাবৃত্তিমূলক (Recursive) সূত্র তৈরি করেন। এই সূত্রের মাধ্যমে উইটেনের বিখ্যাত অনুমানের একটি নতুন, সুন্দর ও জ্যামিতিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এর ফলে জ্যামিতি, টপোলজি এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
গণিত ছিল তাঁর কাছে নতুন পথের অনুসন্ধান
মরিয়ম মির্জাখানির গবেষণার পদ্ধতিও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি ছোট কাগজে সমীকরণ লেখার চেয়ে বড় সাদা কাগজ মেঝেতে বিছিয়ে রেখা, বক্ররেখা, গ্রাফ ও নানান চিত্র আঁকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তাঁর কাছে গাণিতিক সমস্যা ছিল কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং দৃশ্যমান এক জগত, যেখানে চিত্রের মাধ্যমে ধারণাগুলোকে স্পষ্ট করা যায়।
তিনি একবার বলেছিলেন,
"গণিত করার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এটি যেন একটি গভীর বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে নতুন কোনো পথ খুঁজে পাওয়ার মতো।"
এই দর্শনই তাঁর গবেষণাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে এবং জটিল গাণিতিক সমস্যার অভিনব সমাধান খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে।
নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক
ফিল্ডস মেডেল অর্জনের মাধ্যমে মরিয়ম মির্জাখানি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যই অর্জন করেননি; তিনি গণিতের মতো পুরুষ-প্রাধান্যপূর্ণ একটি ক্ষেত্রে নারীদের সক্ষমতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর অর্জন বিশ্বের অসংখ্য তরুণীকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিত গবেষণায় এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে।
দুঃখজনকভাবে, ২০১৭ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে স্বল্পায়ু জীবনেও তিনি এমন সব গবেষণা রেখে গেছেন, যা আধুনিক গণিতের ভিত্তিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
আজও মরিয়ম মির্জাখানির নাম উচ্চারিত হয় এমন একজন গণিতবিদ হিসেবে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন—সৃজনশীলতা, কৌতূহল এবং অধ্যবসায় একত্রিত হলে গণিত শুধু সমীকরণের জগৎ নয়, বরং নতুন জ্ঞান আবিষ্কারের এক সীমাহীন অভিযাত্রায় পরিণত হতে পারে।