হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের গাড়িবহরে হামলা ও নেতা-কর্মীদের মারধরের ঘটনায় মামলা গ্রহণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে দলটি। তবে পুলিশের বাধার কারণে হবিগঞ্জ শহরে পৌঁছাতে পারেননি এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। পরে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের অবস্থান কর্মসূচি শেষ করে তাঁরা বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে অভিযোগ জমা দেন।
বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রুহুল আমিন তালুকদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এনসিপির চারজন নেতা কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে মঙ্গলবারের হামলার ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সদর মডেল থানায় মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ
গত মঙ্গলবার বিকেলে হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে দলটির নেতাদের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করে দলটি। এ সময় নেতা-কর্মীদের মারধর করা হয় বলেও দাবি করা হয়।
পরে সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরে এনসিপির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হলে সেখানে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে এনসিপি বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেয়।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ বিএনপি ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও পাল্টা প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে।
পুলিশের বাধার অভিযোগ
১৪৪ ধারা জারি হওয়ার পরও হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জাতীয় নারী শক্তির সদস্যসচিব মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা।
এনসিপির নেতারা অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জে প্রবেশের পথে পুলিশ তাঁদের গাড়িবহর আটকে দেয় এবং সামনে এগোতে নিরুৎসাহিত করে।
এর আগে বিকেল চারটার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও এলাকায় চা-কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা–সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দেওয়া হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
পুলিশের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বাগ্বিতণ্ডার পর বুধবার বিকেল পাঁচটার দিকে আবার যাত্রা শুরু করেন এনসিপির নেতারা।
অভিযোগে ১১ জনের নাম, অজ্ঞাত ১০০
কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়ি সূত্র জানায়, লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলম।
অভিযোগে বাদী করা হয়েছে হবিগঞ্জ জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তারেক রুবেলকে।
অভিযোগে ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নাম উল্লেখ করা ১১ আসামির পরিচয় জানা যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা হিসেবে গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
‘বিচার নিশ্চিত করতে হবে’: নাহিদ ইসলাম
অভিযোগ জমা দেওয়ার পর রাত পৌনে ৯টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, পুলিশ যদি নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে চায় এবং অতীতের দলীয়করণের অভিযোগ থেকে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাহলে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে হবে, যাতে তাঁরা পালিয়ে যেতে না পারেন। তাঁর ভাষ্য, আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত হলে দেশে ন্যায়বিচারের পরিবেশ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা যাবে।
তিনি বলেন, অন্যথায় দেশের মানুষ মনে করবে, আবারও একটি ‘মাফিয়া রাষ্ট্রের’ দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার আগের ধারার রাজনীতির পথ অনুসরণ করছে।
তিনি বলেন, সরকার অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় থেকে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, গণভোটের রায় মানা হয়নি এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মহাসড়ক ছাড়লেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা
পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ দেওয়ার পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে এনসিপির নেতা-কর্মীরা ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক থেকে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
এরপর মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
ব্রিফিং শেষে নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলমসহ এনসিপির নেতারা মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা হন।
ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষা
এখন এনসিপির নেতারা অপেক্ষা করছেন, পুলিশ অভিযোগটি কীভাবে গ্রহণ করে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়।
দলটির পক্ষ থেকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করা হলেও, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্তের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।