ঢাকা

ভিসা বাতিলে যুক্তরাষ্ট্রের কড়াকড়ি, পৌনে ২ লাখ মানুষ হারালেন ভ্রমণ-অভিবাসন সুবিধা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযানের মধ্যে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। একই সঙ্গে ভ্রমণ ও অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা হারিয়েছেন আরও হাজারো মানুষ।

সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত এক তথ্যবিবরণীতে ভিসা বাতিলের এই পরিসংখ্যান জানানো হয়েছে। দপ্তরের ভাষ্য, নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে, যাঁরা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন, অপরাধে জড়িয়েছেন, জালিয়াতি করেছেন, সহিংসতায় উসকানি দিয়েছেন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে কঠোরতার বিষয়টি গত এক বছর ধরে স্পষ্ট হয়ে উঠলেও বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিলের এই পরিসংখ্যান সেই অভিযানের ব্যাপকতা আরও সামনে এনেছে।

এক বছরে ভিসা বাতিলের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে

গত জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, তারা এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে। সে সময় ওই সংখ্যা ছিল রেকর্ড। এরপর ধারাবাহিকভাবে ভিসা যাচাই ও বাতিলের কার্যক্রম চালিয়ে এখন সেই সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, ভিসাধারীদের আচরণ ও তাঁদের বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, তাঁরা ভিসার শর্ত মেনে চলছেন কি না এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য কোনো ধরনের হুমকি তৈরি করছেন কি না।

দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক ভিসা পাওয়ার পর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে কিংবা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করলে তাঁর ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

অপরাধ ও ভিসার শর্ত লঙ্ঘন প্রধান কারণ

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভিসা বাতিলের পেছনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও অনিয়ম রয়েছে। এর মধ্যে হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধ উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া ভিসার শর্ত লঙ্ঘন, জালিয়াতি, সহিংসতায় উসকানি এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত কর্মকাণ্ডও ভিসা বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দপ্তর কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথাও জানিয়েছে। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আরেকজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মানব পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অন্য একজনের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের উপকরণ রাখার এক ডজনের বেশি অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনি অবস্থান বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি আলাদাভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।

‘বার্থ ট্যুরিজম’ নিয়েও ব্যবস্থা

ভিসা বাতিলের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণের অভিযোগও গুরুত্ব পাচ্ছে।

পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত একটি মার্কিন দূতাবাস ১০০টির বেশি ভিসা বাতিল করেছে। এসব ভিসাধারী বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা মূলত সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, যাতে তাঁদের সন্তান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পায়।

এ ধরনের ভ্রমণকে যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণভাবে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন ও নাগরিকত্বের বিষয়গুলোতে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এ ধরনের ভ্রমণও নজরদারির আওতায় এসেছে।

রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণেও ভিসা বাতিল

অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মন্তব্যের কারণেও কিছু বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চার্লি কার্ককে হত্যার ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা কিছু বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তাঁদের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। অন্য একজন মন্তব্য করেছিলেন, ওই ব্যক্তি আরও আগে মারা যাওয়া উচিত ছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এসব বক্তব্যকে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভিসা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু অপরাধ বা অভিবাসনসংক্রান্ত অনিয়ম নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত রাজনৈতিক ও অন্যান্য বক্তব্যও কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।

‘ভিসা একটি সুযোগ, অধিকার নয়’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের বিবৃতিতে ভিসার অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা একটি সুযোগ, অধিকার নয়।

দপ্তর জানিয়েছে, যারা এই সুযোগের অপব্যবহার করবে, তাদের ভিসা বাতিল করতে বিদ্যমান সব ধরনের ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের কর্মকাণ্ডের তদন্ত অব্যাহত রাখবে বলেও জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ ভিসা নিয়ে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও ভিসা পাওয়ার পর তাঁদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়মিত নজরদারির আওতায় থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও কঠোরতা

শুধু ভিসা বাতিল নয়, নতুন করে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে।

আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম যাচাই আরও জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আবেদনকারীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে ভিসা আবেদনের সময় যেমন আবেদনকারীর তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে, তেমনি ভিসা পাওয়ার পরও তাঁর কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে ভিসা বাতিলের সুযোগ রাখা হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে এই নীতির মূল লক্ষ্য জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এমন বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা অবস্থান সীমিত করা, যাঁদের কর্মকাণ্ডকে দেশটির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

অধিকারকর্মীদের সমালোচনা

তবে প্রশাসনের এই কঠোর নীতির সমালোচনা করেছেন অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমকে ভিসা দেওয়ার বা বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য বা মতামতের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিকদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হলে তা অতিরিক্ত নজরদারির পথ তৈরি করতে পারে। এর ফলে অভিবাসী ও বিদেশি নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণ আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তাঁরা মনে করেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন থাকলেও সেই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার যেন অযথা সীমিত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

অভিবাসনবিরোধী অভিযানে আরও কঠোরতা

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বৈধ ভিসা থাকা ব্যক্তিরাও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিলের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রশাসনের অভিবাসননীতি শুধু অবৈধ অভিবাসীদের লক্ষ্য করে সীমাবদ্ধ নেই; বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা অবস্থানের সুযোগ পাওয়া বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও কঠোর যাচাই ও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, কাজ, ভ্রমণ কিংবা পরিবার নিয়ে বসবাসের পরিকল্পনা করা বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও অনিশ্চিত ও কঠোর হয়ে উঠছে।

বিদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন বাস্তবতা

১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিলের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসননীতির কঠোরতার একটি বড় উদাহরণ। অপরাধ, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন ও জালিয়াতির মতো প্রচলিত কারণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ও এখন যাচাইয়ের আওতায় আসছে।

একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এসব পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে অধিকারকর্মীরা বলছেন, অতিরিক্ত নজরদারি ও বিস্তৃত ক্ষমতা ব্যবহারের ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অভিবাসীদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে বা অবস্থান করতে ইচ্ছুক বিদেশি নাগরিকদের জন্য শুধু ভিসার আনুষ্ঠানিক শর্ত পূরণ করাই যথেষ্ট নয়—তাঁদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড, ভিসার শর্ত মেনে চলা এবং অন্যান্য আচরণও প্রশাসনের যাচাইয়ের আওতায় আসছে।

ট্রাম্প প্রশাসন আরও কঠোর অভিবাসননীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে আসায় সামনে ভিসা বাতিল ও যাচাই-বাছাইয়ের পরিধি আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ব্যবস্থা বিদেশি নাগরিকদের জন্য আগের তুলনায় আরও কঠোর, নজরদারিনির্ভর এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স