দেশে গণিত চর্চা ও গণিত অলিম্পিয়াডের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে স্কুলশিক্ষকদের গণিত দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা আইইএলটিএসের আদলে একটি পৃথক গণিত দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা চালুর প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও) ও ইউরোপীয় বালিকা গণিত অলিম্পিয়াড (ইজিএমও) থেকে পদকজয়ী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান।
সাক্ষাৎকালে গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাঁদের অর্জন এবং গণিত নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন পদকজয়ী শিক্ষার্থীরা। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যতে আরও বড় অর্জনের জন্য শুভকামনা জানান।
তৃণমূল পর্যায়ে গণিত অলিম্পিয়াড সম্প্রসারণের উদ্যোগ
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ বালিকা গণিত ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে গণিত অলিম্পিয়াডের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করা হয়।
বক্তারা বলেন, রাজধানী ও বড় শহরের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদেরও গণিত চর্চা ও অলিম্পিয়াডের সুযোগের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি দূর করে যুক্তিনির্ভর চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও সৃজনশীল গণিত চর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এ উদ্যোগে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই আশ্বাসের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গণিত অলিম্পিয়াডের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্কুল পর্যায়ে গণিত অলিম্পিয়াডে তহবিল
স্কুলপর্যায়ে গণিত অলিম্পিয়াডের কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রসারণের জন্য একটি পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়।
প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে অর্থায়নে তাৎক্ষণিক সম্মতি দেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে স্কুল পর্যায়ে গণিত অলিম্পিয়াড আয়োজন, শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ এবং গণিতভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সুযোগ বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত অনুশীলন, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করা গেলে শুধু আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য শিক্ষার্থী প্রস্তুত করাই নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষার্থীদের গাণিতিক যুক্তি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও বাড়ানো সম্ভব।
অ্যাকটিভিটি ওরিয়েন্টেড ম্যাথমেটিকস চালুর প্রস্তাব
বাংলাদেশ ম্যাথমেটিক্যাল অলিম্পিয়াড কমিটির (বিডিএমও) পক্ষ থেকে স্কুল পর্যায়ে ‘অ্যাকটিভিটি ওরিয়েন্টেড ম্যাথমেটিকস’ চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাবেও সম্মতি জানান।
প্রচলিত পদ্ধতিতে শুধু পাঠ্যবই ও সূত্রনির্ভর গণিত শেখার পরিবর্তে বিভিন্ন কার্যক্রম, বাস্তব উদাহরণ ও সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণিত শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেয় অ্যাকটিভিটি ওরিয়েন্টেড পদ্ধতি। এর মাধ্যমে গণিতকে মুখস্থনির্ভর বিষয়ের পরিবর্তে আনন্দদায়ক ও ব্যবহারিক শিক্ষার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্কুল পর্যায়ে এ ধরনের কার্যক্রম চালু করা গেলে শিক্ষার্থীদের গণিতের প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে উচ্চতর গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইইএলটিএসের আদলে গণিত দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা
সাক্ষাৎকালে স্কুলশিক্ষকদের গণিত দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য একটি নতুন পরীক্ষাপদ্ধতি চালুর প্রস্তাবও উঠে আসে। ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত পরীক্ষা আইইএলটিএসের আদলে স্কুলশিক্ষকদের জন্য পৃথক গণিত দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রস্তাবের লক্ষ্য হিসেবে শিক্ষকদের গণিত বিষয়ে দক্ষতা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র চিহ্নিত করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের গণিত শেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষকদের গণিত জ্ঞান ও প্রয়োগক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে স্কুল পর্যায়ে গণিত শিক্ষার মান উন্নয়নে তা ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সাফল্য
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড ও ইউরোপীয় বালিকা গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বিভিন্ন পদক অর্জন করেছেন। তাঁদের এই সাফল্য দেশের গণিত শিক্ষার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী এবং আইএমও ও ইজিএমও ব্রোঞ্জ পদকজয়ী মনামী জামান; চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও আইএমও রৌপ্য পদকজয়ী মো. রায়হান সিদ্দিকী; ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী ও আইএমও ব্রোঞ্জ পদকজয়ী জাওয়াদ হামীম চৌধুরী; ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ও আইএমও ব্রোঞ্জ পদকজয়ী মোহাম্মদ মারজুক রহমান; আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী ও আইএমও ব্রোঞ্জ পদকজয়ী তাহসিন খান; রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ও আইএমও ব্রোঞ্জ পদকজয়ী এম. জামিউল হোসেন এবং একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও ইজিএমও ব্রোঞ্জ পদকজয়ী সাজি সেহনাই।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব শিক্ষার্থীর সাফল্যকে বাংলাদেশের গণিত চর্চার অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক অংশগ্রহণ ও পদক অর্জনের মাধ্যমে দেশের শিক্ষার্থীরা যে সম্ভাবনার পরিচয় দিচ্ছেন, তা কাজে লাগাতে স্কুল পর্যায় থেকেই গণিতভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আলোচনা
সাক্ষাৎকালে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিক্যাল অলিম্পিয়াডের জাতীয় কোচ মাহবুবুল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ বালিকা গণিত ফাউন্ডেশনের চেয়ার অধ্যাপক সাদিয়া হামিদ কাজী এবং বাংলাদেশ ম্যাথমেটিক্যাল অলিম্পিয়াড কমিটির সদস্য মো. আবদুল হাকিম খান।
আলোচনায় গণিত অলিম্পিয়াডের পরিধি বাড়ানো, স্কুল পর্যায়ে গণিতভিত্তিক কার্যক্রম চালু, তৃণমূলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের গণিত দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রস্তাব উঠে আসে।
গণিত শিক্ষায় নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এসব উদ্যোগে সহযোগিতা ও প্রস্তাবগুলো বিবেচনার আশ্বাস দেওয়ায় দেশের গণিত শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ে গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য তহবিল, অ্যাকটিভিটি ওরিয়েন্টেড ম্যাথমেটিকস চালু এবং শিক্ষকদের জন্য গণিত দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার প্রস্তাব—তিনটি উদ্যোগই গণিত শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিতভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও গণিত চর্চার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের যুক্তিনির্ভর ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ বাড়বে।
আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক সাফল্যকে সামনে রেখে গণিত শিক্ষার বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ানোর এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও দক্ষ ও গণিতমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।