ঢাকা

রাষ্ট্রপতি ভোটে কর্নেল অলির পক্ষে দুই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কারণ কী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। একই প্রার্থীর পক্ষে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনে কোনো বাধা না থাকলেও একই দিনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে প্রথমে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অলি আহমদের পক্ষে একটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১–দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের ডজনখানেক নেতা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে মনোনয়নপত্রটি জমা দেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন।

এর কয়েক ঘণ্টা পর বেলা ৩টার দিকে একই প্রার্থীর পক্ষে আরও একটি মনোনয়নপত্র জমা দেন ১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা। ফলে বিরোধী দলগুলোর এই জোটের প্রার্থী অলি আহমদের পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মোট দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে একটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

কেন দুটি মনোনয়নপত্র

রাষ্ট্রপতি পদে একই প্রার্থীর পক্ষে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে আইনগত বাধা নেই। তবে অলি আহমদের ক্ষেত্রে কেন দুটি মনোনয়নপত্র দেওয়া হলো, সেটিই বৃহস্পতিবারের রাজনৈতিক ও নির্বাচনসংক্রান্ত আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে।

জামায়াত ও ১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের ত্রুটি বা অসংগতি যাতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁদের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের কারণ না হয়, সে সতর্কতা থেকেই দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জামায়াত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কোনো ধরনের ফাঁকফোকর যাতে না থাকে, সে জন্যই দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নতুন কোনো নজির নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একাধিক মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমা দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে।

জামায়াতের পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেনও একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা এবং তাঁদের মধ্য থেকেই প্রস্তাবক ও সমর্থক নির্ধারিত হবেন। একাধিক প্রস্তাবক ও সমর্থক থাকলেও এতে কোনো সমস্যা নেই। তাই কোনো ধরনের ত্রুটি এড়াতে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

নামের গরমিল নিয়ে সতর্কতা

নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অলি আহমদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পেছনে সম্ভাব্য ভুলত্রুটি এড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে জমা দেওয়া মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর নামের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা নামের কিছুটা গরমিলের বিষয় সামনে আসে। এরপর মনোনয়নপত্রে কোনো ধরনের ত্রুটি থেকে গেলে তা যাতে প্রার্থিতার ওপর প্রভাব না ফেলে, সে সতর্কতা থেকে দ্বিতীয় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কারণ সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কমিশনের বক্তব্য হলো, কেন দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, সেটি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক জোটের বিষয়।

ইসিতে মোট তিন মনোনয়নপত্র

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, কমিশন মোট তিনটি মনোনয়নপত্র পেয়েছে।

এর মধ্যে দুটি অলি আহমদের এবং একটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের।

অলি আহমদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, কমিশনের কাছে দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে—এটাই তাঁদের দেখার বিষয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর আইন অনুযায়ী প্রথম মনোনয়নপত্রটি বৈধ হলে দ্বিতীয়টি আর বাছাই করার প্রয়োজন হবে না। দুটি মনোনয়নপত্র কেন জমা দেওয়া হয়েছে, সে ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট ১১–দলীয় ঐক্যের নেতারাই দিতে পারবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে ইসি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দলটি একটি মনোনয়নপত্রই জমা দিয়েছে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

অলি আহমাদ ১১–দলীয় জোটের প্রার্থী

কর্নেল (অব.) অলি আহমাদ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান। তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) এই জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও ১১–দলীয় ঐক্য পৃথক প্রার্থী দিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় দুই রাজনৈতিক পক্ষের প্রার্থী এখন সামনে রয়েছে।

তবে সংসদে দুই পক্ষের আসনসংখ্যার বড় ব্যবধানের কারণে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগেই একটি সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে।

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ১৬ আগস্ট

জমা হওয়া মনোনয়নপত্র এখন যাচাই-বাছাই করবে নির্বাচন কমিশন। ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে মনোনয়নপত্রগুলো যথাযথ আছে কি না, তা যাচাই করা হবে।

এ কাজে সহযোগিতা করতে জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে একজন কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনে আসবেন। প্রার্থীদের স্বাক্ষরসহ মনোনয়নপত্রের প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হবে।

যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। এরপর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের সভাকক্ষে। এই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই; শুধু জাতীয় সংসদের সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন গত ৬ আগস্ট ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।

এর আগে গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগ মনোনীত ও নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পরই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। সেই সময়সীমার মধ্যেই বর্তমান নির্বাচন আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন।

সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এগিয়ে বিএনপি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে। বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১–দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৯০।

ফলে সংসদে আসনসংখ্যার হিসাবে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের হিসাবেও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফলাফল অনেকটাই নির্ধারিত।

তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল নিশ্চিত হবে ভোট গ্রহণ এবং নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার পর।

অন্যদিকে অলি আহমদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি মূল নির্বাচনী ফলাফলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সতর্কতা ও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে। জোটের নেতারা বলছেন, প্রার্থিতায় কোনো ধরনের কারিগরি বা আইনগত ত্রুটি যাতে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে কারণেই দ্বিতীয় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

সামনে যাচাই-বাছাই ও ভোট

এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ হলো মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র পরীক্ষা শেষে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর ১৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। সবশেষে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের সভাকক্ষে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

অলি আহমদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়লেও আইনগতভাবে এতে কোনো বাধা নেই। যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রথম মনোনয়নপত্র বৈধ হলে দ্বিতীয়টি আর বিবেচনার প্রয়োজন হবে না। ফলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালটে কোন প্রার্থীদের নাম থাকবে, তা নির্ধারিত হবে নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাই ও পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে।

তবে বর্তমান সংসদে বিএনপির সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে ফলাফল যাওয়ার সম্ভাবনাই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে জোরালো। এখন আনুষ্ঠানিক ভোট ও নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার অপেক্ষা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স