একটি দেশের উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নানা সূচকের সমন্বয়েই একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নির্ধারিত হয়। এসব সূচকের মধ্যে নারীশিক্ষার অগ্রগতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীকে শিক্ষার মূলধারার বাইরে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নারীশিক্ষার প্রসারে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপবৃত্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং নারীর ক্ষমতায়নের নানা পদক্ষেপের ফলে এর ইতিবাচক প্রভাবও পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, বেড়েছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাদের সাফল্যও।
এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল। এবারের ফলাফলে পাসের হার এবং জিপিএ-৫—দুই সূচকেই ছেলেদের পেছনে ফেলেছে মেয়েরা। শুধু সামগ্রিক ফলাফলে নয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলও মেয়েদের ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরছে।
বিষয়টি নিঃসন্দেহে আনন্দের। তবে এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে—ছেলেরা কেন পিছিয়ে পড়ছে এবং তাদের শিক্ষায় মনোযোগ ও সাফল্য কীভাবে বাড়ানো যায়।
এসএসসির ফলাফলে মেয়েদের স্পষ্ট অগ্রগতি
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পার্থক্যটি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবার সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯ লাখ ১১ হাজার ছাত্রীদের মধ্যে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ মেয়েদের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
অন্যদিকে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছাত্রের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন। ছেলেদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
পাসের হারের ব্যবধানই শুধু নয়, সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনের ক্ষেত্রেও মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। এবার ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে। বিপরীতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫২ হাজার ৭৮০ জন ছাত্র।
অর্থাৎ পাসের হার এবং জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই মেয়েদের সাফল্য ছেলেদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
১১টি শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলে এই চিত্র উঠে এসেছে। ফলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল নয়; বরং জাতীয় পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের শিক্ষাগত ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা।
দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে শিরোনাম ছিল, ‘এসএসসি ও সমমানে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬, এগিয়ে ছাত্রীরা।’ কালের কণ্ঠ লিখেছে, ‘জিপিএ ৫-এ এবারও এগিয়ে মেয়েরা।’ সমকালের শিরোনাম ছিল, ‘পাসের হার ও জিপিএ-৫-এ এবারও এগিয়ে মেয়েরা।’
আন্তর্জাতিক ও ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমেও একই প্রবণতা উঠে এসেছে। দ্য ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেসের শিরোনাম ছিল, ‘এসএসসির ফলাফলে আবারও ছেলেদের ছাড়িয়ে গেল মেয়েরা।’ ঢাকা ট্রিবিউনও জানিয়েছে, পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ভালো করেছে।
বিভিন্ন স্কুলের ফলাফলেও একই চিত্র
জাতীয় পর্যায়ের ফলাফলের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল দেখলেও মেয়েদের এগিয়ে থাকার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছেলেদের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৯৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। একই শহরের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩২৭ জন শিক্ষার্থী।
ময়মনসিংহ জেলাস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬৫ জন। বিপরীতে একই শহরের বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৩৬ জন।
কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়, যা কিশোরগঞ্জ বয়েজ হাইস্কুল নামেও পরিচিত, সেখান থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৪ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের সরযূ বালা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯২ জন।
নেত্রকোনার আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৫ জন শিক্ষার্থী। বিপরীতে নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৩ জন।
অবশ্য এসব উদাহরণ দিয়ে দেশের সব ছেলেদের স্কুল বা সব মেয়েদের স্কুলের ফলাফলকে এক কাতারে বিচার করা যাবে না। অনেক ছেলেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অসাধারণ ফলাফল হয়েছে। আবার কোনো কোনো মেয়েদের প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। তাই পৃথক প্রতিষ্ঠানের ফলাফলকে জাতীয় প্রবণতার একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফলাফল এবং জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান একসঙ্গে বিবেচনা করলে মেয়েদের শিক্ষাগত অগ্রগতির বিষয়টি স্পষ্টভাবেই সামনে আসে।
মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার কারণ কী
মেয়েদের এই সাফল্যকে স্বাভাবিকভাবেই স্বাগত জানাতে হবে। কারণ, মেয়েরা এগিয়ে যাওয়া মানে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা বিকশিত হওয়া।
কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে—মেয়েরা কেন ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে? আর ছেলেরা কেন তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে?
এর কোনো একক উত্তর নেই। সামাজিক, পারিবারিক, শিক্ষাগত ও প্রযুক্তিগত নানা কারণ এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
প্রথমত, গত কয়েক দশকে মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উপবৃত্তি, আর্থিক সহায়তা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধরে রাখার বিভিন্ন উদ্যোগ তাদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করেছে। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নারীদের সাফল্যও মেয়েদের সামনে অনুপ্রেরণার উদাহরণ তৈরি করেছে।
একজন মেয়ে যখন দেখে তার মতো নারীরাও প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, ব্যবসা, রাজনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, তখন তার নিজের মধ্যেও উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার নিয়ে বড় স্বপ্ন তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও সামাজিক চলাফেরার ধরন অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। অনেক ছেলে আড্ডা, বাইরে ঘোরাঘুরি, খেলাধুলা কিংবা মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ব্যয় করে। ফলে পড়াশোনার জন্য তাদের হাতে থাকা সময় কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে অনেক মেয়ে তুলনামূলকভাবে ঘরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে এবং পড়াশোনায় বেশি সময় দিতে পারে। তবে এটিকে সব ছেলে বা সব মেয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখা যাবে না। পরিবার, পরিবেশ ও ব্যক্তিগত অভ্যাস অনুযায়ী পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তৃতীয়ত, মেয়েদের প্রতি পরিবারের বাড়তি নজরদারিও একটি ভূমিকা রাখতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তার নানা উদ্বেগের কারণে অনেক অভিভাবক মেয়েদের চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন, পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমের প্রতি বেশি নজর রাখেন। এর ফলে অনেক মেয়ে পড়াশোনার পরিবেশে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় থাকতে পারে।
চতুর্থত, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতাও অনেক মেয়েকে আরও দৃঢ় করে তুলতে পারে। ইভটিজিং, হয়রানি বা বৈষম্যের মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা অনেক সময় মেয়েদের মধ্যে আত্মনির্ভরতা ও নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার তাগিদ তৈরি করে। তবে এ ধরনের নির্যাতন বা হয়রানিকে কোনোভাবেই মেয়েদের সাফল্যের ইতিবাচক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এসব প্রতিরোধ করা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়িত্ব।
ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ায় অখুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং এই অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন। যে মেয়েরা একসময় শিক্ষার নানা সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল, তাদের আজকের সাফল্য সামাজিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
কিন্তু একই সঙ্গে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ, শিক্ষা কোনো লিঙ্গের বিরুদ্ধে অন্য লিঙ্গের প্রতিযোগিতা নয়। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ। একজন পিছিয়ে পড়লে অন্যজনের সাফল্য দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় না।
ছেলেরা যদি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষায় অনাগ্রহী হয়ে পড়ে, তাহলে একসময় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। শিক্ষার বাইরে থাকা তরুণদের একটি অংশ তখন নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।
তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত মেয়েদের অগ্রগতি থামানো নয়; বরং ছেলেদেরও প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনা।
কী করা যেতে পারে
ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্য একটি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, ভালো ফলাফল ও শিক্ষায় ধারাবাহিকতার জন্য বৃত্তি, উপবৃত্তি এবং বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মসূচি আরও কার্যকর করা দরকার। এসব উদ্যোগ যেন শুধু একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রয়োজন ও মেধার ভিত্তিতে ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য কার্যকর হয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ছেলেদের পড়াশোনার প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। কোনো ছেলে কেন পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে, তার পেছনে কী কারণ কাজ করছে—তা চিহ্নিত করা জরুরি। শুধু বকাঝকা বা শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। প্রয়োজন তাদের সঙ্গে কথা বলা, মানসিকতা বোঝা এবং উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া।
তৃতীয়ত, মুঠোফোন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভবও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। কিন্তু প্রযুক্তির শিক্ষামূলক ব্যবহার এবং বিনোদননির্ভর অতিরিক্ত ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে হবে।
অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনলাইন গেম কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে বিনোদনে ডুবে থাকা পড়াশোনার ক্ষতি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু ছেলেদের নয়, মেয়েদের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
চতুর্থত, খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক যোগাযোগও প্রয়োজন। তবে এগুলোর সঙ্গে পড়াশোনার ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।
একই সঙ্গে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। মেয়েরা ছেলেদের মতোই শিক্ষার অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মানের অধিকারী—এ বিষয়টি ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের শেখানো প্রয়োজন। একইভাবে ছেলেদের প্রতিও মেয়েদের সম্মান ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে।
পঞ্চমত, মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সমস্যার বিরুদ্ধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো কিশোর যদি পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে শুধু তার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মেয়েদের সাফল্য ধরে রেখে ছেলেদেরও এগিয়ে নিতে হবে
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মেয়েদের ভালো ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের বৈষম্য কাটিয়ে মেয়েরা আজ শিক্ষাক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। এই অর্জন ধরে রাখতে হবে।
তবে একই সঙ্গে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণও অনুসন্ধান করতে হবে। মেয়েদের এগিয়ে যাওয়াকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না; বরং ছেলেদেরও কীভাবে আরও ভালোভাবে শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে।
কারণ ছেলে ও মেয়ে—দুজনই পরিবারের সন্তান, সমাজের সম্পদ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। মেয়েরা পিছিয়ে থাকলে যেমন দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি বিপুলসংখ্যক ছেলে শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাই প্রয়োজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, সুস্থ প্রতিযোগিতা; এক পক্ষকে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নয়, বরং উভয় পক্ষের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি বাড়ানো, মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং ছেলে-মেয়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করার মধ্য দিয়েই একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন ছেলে ও মেয়ে উভয়েই নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারবে। মেয়েদের অগ্রগতি যেমন আমাদের সাফল্য, তেমনি ছেলেদের সাফল্যও দেশের সাফল্য। লক্ষ্য হওয়া উচিত—কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে।
লেখক: মো. মোতাহার হোসেন, সাবেক প্রধান শিক্ষক, মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা