ঢাকা

দুর্গম এলাকায় শিক্ষকতায় উৎসাহ দিতে দূরত্বভিত্তিক ভাতা চালু হবে: ববি হাজ্জাজ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করতে দূরত্ব ও যাতায়াতের বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেছেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ের অবস্থান, যাতায়াতের দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা এবং দুর্গমতার মাত্রা বিবেচনা করে এই ভাতার কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।

দেশের বিভিন্ন জেলার দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকে এ উদ্যোগের আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রোববার (৩০ আগস্ট ২০২৬) রংপুরের পিটিআই অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ববি হাজ্জাজ।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয় এ কর্মশালার আয়োজন করে।

দুর্গম এলাকা চিহ্নিত করে ভাতার কাঠামো

দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা চালুর প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোন কোন এলাকাকে প্রকৃত অর্থে দুর্গম হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সেখানে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক ও কর্মকর্তারা কী ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন, তা নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, শুধু প্রশাসনিকভাবে কোনো এলাকাকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করলেই হবে না; ওই এলাকার বাস্তব যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের দূরত্ব এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রতিদিনের চলাচলের সমস্যাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে দুর্গম এলাকা চিহ্নিত করার বিষয়ে কর্মশালায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ববি হাজ্জাজ বলেন, এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত ও সুপারিশ লিখিতভাবে সংকলন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি অঞ্চলভেদে বিদ্যমান বৈষম্য কমাতে সরকার বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিচ্ছে।

দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষকরা যাতায়াতসহ নানা ধরনের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হন। ফলে এসব এলাকায় শিক্ষক ধরে রাখা এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় দূরত্ব ও দুর্গমতার ভিত্তিতে ভাতা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রত্যন্ত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক কাঠামোয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জবাবদিহি সুস্পষ্ট করে কার্যকর নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ববি হাজ্জাজ।

তিনি বলেন, শুধু পদসোপান থাকলেই হবে না। প্রত্যেক কর্মকর্তাকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবস্থার প্রতিও দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের একটি স্তরের কাজ যেন অন্য স্তরের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিদ্যালয় পর্যন্ত সমন্বিত কর্মশৃঙ্খলা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষকে আরও কার্যকর করা। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও সংস্কারের সুফল শেষ পর্যন্ত যেন শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশে প্রতিফলিত হয়, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হবে ‘সায়েন্স টয়’

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সব কার্যক্রমের চূড়ান্ত গন্তব্য বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ—এ কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ‘সায়েন্স টয়’ কার্যক্রম চালু করা হবে।

তাঁর মতে, শিশুদের শুধু বইনির্ভর শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা ও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ দিতে হবে। এ ধরনের কার্যক্রম শিশুদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তৈরি করা প্রয়োজন। ‘সায়েন্স টয়’ কার্যক্রমের মাধ্যমে খেলাধুলার সঙ্গে বিজ্ঞান শেখাকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন কারিকুলামে আটটি ক্রীড়া কার্যক্রম বাধ্যতামূলক

প্রাথমিকের নতুন কারিকুলামে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নতুন কারিকুলামে আটটি ক্রীড়া কার্যক্রম বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শিশুদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই এর লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান পরিচালনার প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।

শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক শিক্ষককে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, শিক্ষক বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না থাকলে বা দায়িত্ব অন্য কারও মাধ্যমে পরিচালনা করলে শিক্ষার্থীদের শেখার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম এবং পাঠদানের মান—তিনটি বিষয়েই কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন।

বিশ্বমানের প্রাথমিক শিক্ষা গড়ার লক্ষ্য

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, মানসম্মত ও বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব ও কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলেও জানান ববি হাজ্জাজ।

তিনি বলেন, আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নৈতিক শিক্ষা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং ক্যারিয়ারমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।

শুধু বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে না—এর সঙ্গে শিক্ষক, প্রশাসন, পাঠদান পদ্ধতি, মনিটরিং ও জবাবদিহির সমন্বয় প্রয়োজন বলেও কর্মশালায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত গুরুত্ব পাবে

দুর্গম এলাকার শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, রাজধানী বা বিভাগীয় পর্যায় থেকে দুর্গমতার মাত্রা সব সময় যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোন এলাকা কতটা দুর্গম, সেখানে যাতায়াতের বাস্তবতা কেমন এবং দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

কর্মশালায় এসব বিষয়ে আলোচনা শেষে লিখিত মতামত ও সুপারিশ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এরপর বাস্তবতার ভিত্তিতে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন যাঁরা

রংপুর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী, পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ কামরুল হাসান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ইসরাত জাহান।

এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা রংপুর বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক, বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট, ইউপিটিসি ইন্সট্রাক্টরসহ প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন।

দিনব্যাপী কর্মশালায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষা কার্যক্রমের মনিটরিং, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামো সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

দুর্গম ও চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ধরে রাখা এবং নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জবাবদিহি বাড়ানো—এই দুই দিককে গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা কর্মশালায় তুলে ধরা হয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স