ঢাকা

দিল্লিতে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্টদের সেমিনার বাতিল, অনুমতি দেয়নি প্রশাসন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কয়েকজন বক্তাকে নিয়ে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। আয়োজকদের জানানো হয়েছে, ‘কিছু বিতর্কের’ কারণে অনুষ্ঠানটির অনুমতি দেওয়া যাচ্ছে না।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত নয়াদিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে দিল্লি পুলিশকে অনুরোধও জানিয়েছিলেন আয়োজকেরা। তবে অনুষ্ঠানের দিনই পুলিশ জানিয়ে দেয়, এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানটি বাতিলের বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, আলোচনায় বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কয়েকজন ব্যক্তির অংশ নেওয়ার কথা থাকায় শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া হয়নি।

তাঁদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে নতুন কোনো বিতর্ক বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি এড়াতেই দিল্লি পুলিশ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যে সেমিনারের অনুমতি মেলেনি

‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক আলোচনা সভাটির আয়োজন করেছিল নয়াদিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি)। বেলজিয়ামভিত্তিক সংগঠন ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

আলোচনার মূল বিষয় ছিল ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংলাপ, অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন। আয়োজকদের পরিকল্পনায় একটি প্রশ্নোত্তর পর্বও রাখা হয়েছিল। এই পর্বে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, গবেষক ও অধিকারকর্মীদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

আমন্ত্রিত বক্তাদের তালিকায় ছিলেন বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ এবং মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী নুরান নবী।

এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলম, ইউনাইটেড ডিপ্লোমেটিক কাউন্সিলের সভাপতি আসিফ ইকবাল এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম জিলানিসহ আরও কয়েকজনের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।

চেক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিবিদ ওন্দ্রেজ দোস্তাল এবং জার্মান রাজনীতিবিদ পিটার ফারেনহোল্টজও আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

‘কিছু বিতর্কের’ কারণে অনুমতি নয়

শনিবারই দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজকদের জানানো হয়, অনুষ্ঠানটির অনুমতি দেওয়া যাচ্ছে না।

আয়োজকদের দেওয়া আবেদনপত্রে হাতে লেখা নোটে অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে ‘কিছু বিতর্ক’-এর কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে বিতর্কের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা বিস্তারিতভাবে জানায়নি পুলিশ।

এফসিসির সভাপতি ওয়াইল আওয়াদ গণমাধ্যমকে বলেন, অনুষ্ঠানটি ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন নিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। পুলিশ কেন অনুষ্ঠানটির অনুমতি দিল না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলেও জানান।

ফলে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার অনুপস্থিতিতে অনুমতি বাতিলের পেছনের কারণ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতির পর টানাপোড়েন

দিল্লিতে নতুন এই আলোচনা সভার অনুমতি না দেওয়ার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা রয়েছে।

গত ৫ আগস্ট একই ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাবে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন।

ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ওই অনুষ্ঠানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এ ধরনের ‘অবাঞ্ছিত প্ররোচনা’ বন্ধের নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়।

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের দাবিও ওই সময় নতুন করে জোরালোভাবে জানানো হয়েছিল।

এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও পিছিয়ে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, শনিবারের অনুষ্ঠানকে ঘিরে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক বা উত্তেজনা তৈরি হোক—দিল্লি তা চাইছে না।

বিশেষ করে অনুষ্ঠানের বক্তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই হয়তো পুলিশ শেষ মুহূর্তে অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশকে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা?

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রের মতে, শনিবারের আলোচনা সভা বন্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকেও একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তাঁদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের উন্নতির স্বার্থে নয়াদিল্লি নতুন করে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়াতে চায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে ভারতের মাটিতে কোনো অনুষ্ঠান থেকে এমন বক্তব্য বা আলোচনা তৈরি হোক, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে—সেটি এড়ানোর চেষ্টা থাকতে পারে।

ওয়াকিবহাল মহলের একটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ভারত যে আগ্রহী, দিল্লি পুলিশের এই সিদ্ধান্তকে তার একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

যদিও এ বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দিল্লির অবস্থান কী

শেখ হাসিনাকে ঘিরে আগের অনুষ্ঠানের বিতর্কের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বলেছে, ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি বেসরকারি প্ল্যাটফর্ম থেকে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সরকারের অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এর আগে শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হলেও নয়াদিল্লি বারবার বিষয়টি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে।

এই পরিস্থিতিতে শনিবারের অনুষ্ঠানের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, অনুষ্ঠানটি কোনো সরাসরি রাজনৈতিক সমাবেশ না হলেও সেখানে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। পাশাপাশি প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনায় আসার সম্ভাবনাও ছিল।

প্রশ্নোত্তর পর্ব নিয়েও ছিল আশঙ্কা

আলোচনা সভার অন্যতম অংশ ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ ছিল বক্তাদের।

ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, এই পর্বেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এমন কোনো মন্তব্য উঠে আসার আশঙ্কা ছিল, যা নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিকে ঘিরে এর আগে একই ক্লাবে যে ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশ হয়তো সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে চেয়েছে।

তবে পুলিশের নোটে শুধু ‘কিছু বিতর্ক’-এর কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট বক্তাদের উপস্থিতির বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

আয়োজকদের বক্তব্যে বিস্ময়

অনুষ্ঠানের অনুমতি না পাওয়ায় এফসিসির সভাপতি ওয়াইল আওয়াদ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, অনুষ্ঠানটি ছিল অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন নিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আয়োজনটির উদ্দেশ্য ছিল কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো নয়।

তবে পুলিশ কেন শেষ মুহূর্তে অনুমতি দেয়নি, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।

এ কারণে অনুষ্ঠান বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।

সম্পর্কের নতুন সমীকরণে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত

দিল্লিতে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট বক্তাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

একদিকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলটির নেতাদের নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও বর্তমানে সংবেদনশীল একটি পর্যায়ে রয়েছে।

এই অবস্থায় ভারতের রাজধানীতে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের অনুমতি শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদিও সিদ্ধান্তটির আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে কেবল ‘কিছু বিতর্কের’ কথা বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মহল এটিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটেই দেখছে।

বিশেষ করে একই ভেন্যুতে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিকে ঘিরে সৃষ্ট আগের বিতর্কের পর নতুন কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা এড়াতে দিল্লির সতর্ক অবস্থানই শনিবারের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তবে এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত অনুমতি না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স