ঢাকা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকার কড়া সমালোচনা, গুম প্রতিরোধ দিবসে ১১–দলীয় ঐক্যের সমাবেশ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কড়া সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের নেতারা। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে তাঁরা অভিযোগ করেছেন, নতুন আইনের কাঠামো গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে পারবে না।

তাঁদের দাবি, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল না করে সেটিকেই কার্যকর রাখতে হবে এবং জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে গুম ও মানবাধিকার কমিশন গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত কোনো বাহিনী বা সংস্থার হাতে তদন্তের দায়িত্ব না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পদযাত্রা ও সমাবেশ করে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ জাতীয় কমিটি। কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন জাতীয় কমিটির নেতা ও ‘আয়নাঘরের বন্দী’ হিসেবে পরিচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ ছিলেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের নেতা-কর্মী।

দিনের কর্মসূচির একপর্যায়ে একটি প্রতিনিধিদল জাতীয় সংসদে গিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে ১৪ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি দেয়। এর মধ্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার দাবিও রয়েছে।

বাংলামোটরে সমাবেশ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা

রোববার বেলা তিনটার দিকে বাংলামোটর মোড়ে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। সমাবেশে গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করে বক্তব্য দেন হাসিনুর রহমান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যাতে গুমের ঘটনায় মামলা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে হাসিনুর রহমান বলেন, ‘আপনি ইচ্ছা করে দেশটাকে বিপদে ফেলছেন। এমনভাবে আইন করছেন, যাতে কেউ মামলাই করতে না পারে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অধ্যাদেশ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নতুন আইনে বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এখনো সময় আছে, এসব পরিবর্তন করা উচিত। তা না হলে সরকারের অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

সমাবেশে জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ফেরদৌস আজিজ, জামায়াত নেতা ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এবং লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন দলের নেতারা বক্তব্য দেন।

আখতারুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বলেন, ‘গুমের বিচার চাওয়ার আগে আমরা সালাহউদ্দিনের পদত্যাগ চাই।’

সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা

সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে বিকেল পৌনে চারটার দিকে বাংলামোটর মোড় থেকে পদযাত্রা শুরু হয়। পদযাত্রায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদসহ ১১–দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন।

মিছিলের অংশগ্রহণকারীদের অনেকের হাতে গুমবিরোধী বিভিন্ন বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল। তাঁরা গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন।

পদযাত্রায় ‘বাংলাদেশে আয়নাঘর, থাকবে না রে থাকবে না’, ‘ফ্যাসিবাদের আস্তানা, বাংলাদেশে থাকবে না’, ‘গণভোটের গণরায়, মানতে হবে মেনে নাও’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ এবং ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’—এ ধরনের স্লোগান দেওয়া হয়।

বাংলামোটর থেকে পদযাত্রাটি কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট ও খামারবাড়ি গোল চত্বর হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পৌঁছায়। পরে জাতীয় সংসদের সামনের ফুটপাতে গিয়ে পদযাত্রা শেষ হয়। সেখানে আবারও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

‘এই সরকারও গুম করতে চায়’

সংসদের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইনের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, নতুন আইনে গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে দেওয়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতে গুমের ঘটনায় একই ধরনের বাহিনী বা কাঠামো তদন্তের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাঁর ভাষ্য, যে বাহিনী গুমের সঙ্গে জড়িত হতে পারে, তাদের হাতে গুমের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনা যাতে আর ফিরে না আসে, সে জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বহাল রাখার দাবি জানান তিনি।

পরওয়ারের বক্তব্য, গুমের অভিযোগের তদন্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার মাধ্যমে করতে হবে। গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত কোনো সংস্থা বা বাহিনীর হাতে তদন্তের দায়িত্ব থাকলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসার সুযোগ কমে যাবে।

প্রস্তাবিত আইন নিয়ে ১১ দলের আপত্তি

জামায়াত নেতা ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অধ্যাদেশের তুলনায় বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত আইন দুর্বল।

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই গুম ও মানবাধিকার কমিশন–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। নতুন যে আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেটি দিয়ে কার্যকরভাবে গুম প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদও প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারও আগের আওয়ামী লীগ সরকারের মতো গুম ও খুনের পথ অনুসরণ করতে চায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভবিষ্যতে আরও অনেক মাকে সন্তানহারা করার পরিকল্পনা করছেন।’

জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী গুম ও মানবাধিকার কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।

‘নতুন আইন আরও দুর্বল’

জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের সময় উন্নততর একটি আইন করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে আগের ব্যবস্থার চেয়েও দুর্বল আইন করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) বলেন, নতুন আইন গুম ও মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আতিক মোজাহিদ বলেন, যে বাহিনী গুম করবে, তাকে দিয়ে সেই গুমের তদন্ত করানো সম্ভব নয়। তদন্তের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন বাতিলের বিষয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ভূমিকা রাখার কথা জানান জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম।

সমাবেশে জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধানসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য দেন।

সংসদে ১৪ দফা স্মারকলিপি

সংসদের সামনে সমাবেশ চলার সময় হাসিনুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল জাতীয় সংসদে যায়। প্রতিনিধিদলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের পাশাপাশি সংসদের কয়েকজন সদস্যও ছিলেন।

প্রতিনিধিদল স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির ১৪ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি তুলে দেয়।

স্মারকলিপির অন্যতম প্রধান দাবি হলো, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা। একই সঙ্গে গুমের ঘটনা তদন্তে স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা এবং গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

প্রতিনিধিদল সংসদে যাওয়ার পরও সংসদের বাইরে কর্মসূচি অব্যাহত থাকে। সেখানে খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব মিজানুল হক, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন বক্তব্য দেন।

স্পিকারের আশ্বাসে সন্তুষ্টি

১৪ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি দেওয়ার পর সন্ধ্যা ছয়টার কিছু আগে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সংসদ থেকে বেরিয়ে আসেন।

পরে সমাপনী বক্তব্যে গুম প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির নেতা হাসিনুর রহমান স্পিকারের সঙ্গে তাঁদের আলোচনার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, স্পিকার তাঁদের সবগুলো দাবি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং কোনো দাবির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেননি। দাবিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পিকার সর্বাত্মক চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রস্তাবিত আইন ও গুমের তদন্তের দায়িত্ব নিয়ে আপত্তি।

ফলে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচি এবার শুধু গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিচার ও প্রতিকার দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রস্তাবিত আইন, মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা এবং গুমের অভিযোগ তদন্তের কাঠামো নিয়েও সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করেছে ১১–দলীয় ঐক্য।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স