ঢাকা

মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, তবু বিল আসতে দেরি—অসন্তোষ ডেপুটি স্পিকারের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও সময়মতো জাতীয় সংসদে বিল না আসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, মন্ত্রিসভায় কোনো বিল অনুমোদনের পর যত দ্রুত সম্ভব তা আইনসভায় পাঠানো উচিত। এতে সংসদ সদস্যরা বিলটি পর্যাপ্ত সময় নিয়ে পড়ার ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় কিছুটা ব্যত্যয় ঘটছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ উত্থাপনের পর আলোচনা চলাকালে ডেপুটি স্পিকার এসব কথা বলেন। তাঁর সভাপতিত্বেই তখন সংসদের অধিবেশন চলছিল।

বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে বিলটির ওপর প্রতিবেদন দেওয়ার সময় দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

তবে এই সময়সীমা নিয়েও আপত্তি জানান জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান। তাঁর বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয় এবং একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার নিজেও বিল সংসদে আসার সময় এবং সংসদ সদস্যদের হাতে তা পৌঁছানোর প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

দুই কার্যদিবসের সময়সীমা নিয়ে আপত্তি

এপিবিএন বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবের সময় নাজিবুর রহমান বলেন, কিছুদিন ধরে সংসদীয় কমিটিগুলোকে বিভিন্ন বিল পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ও স্বল্প সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি জটিল জাতীয় মানবাধিকার আইনের প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল।

নাজিবুর রহমানের বক্তব্য, সংসদীয় কমিটির কাজ শুধু বিলের ধারা পড়ে মতামত দেওয়া নয়। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অংশীজন, বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার এখতিয়ারও কমিটির রয়েছে।

তিনি বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে সংসদীয় কমিটিগুলো সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

তাঁর ভাষায়, এভাবে সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির অধিকার কার্যত সীমিত করা হচ্ছে, ‘হাত-পা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে’।

‘৮-৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আইন পাস করতে হবে’

নাজিবুর রহমানের আপত্তির জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, আগামী ৮-৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আইনগুলো পাস করতে হবে। কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে যদি অধিবেশনের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট বিলটি ইতিমধ্যে সব সংসদ সদস্যের কাছে পাঠানো হয়েছে।

তবে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই বিল সংসদে আসার সময় এবং সব সংসদ সদস্যের হাতে তা পৌঁছানোর বিষয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান ডেপুটি স্পিকার।

‘এটা আইনসভা’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিষয়টি অনেকেই তাঁদের নজরে এনেছেন।

তিনি বলেন, এটি আইনসভা এবং সংসদের কার্যপ্রণালির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ সময় তিনি সংসদের ৭৭ বিধি বারবার ব্যবহার করতে হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে বিলটি সব সংসদ সদস্যের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সবাই বিলটি পাননি।

এর মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় ও প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর দ্রুত সংসদে পাঠানোর তাগিদ

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিল সংসদে আসতে দেরি হওয়া নিয়ে সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করেন ডেপুটি স্পিকার।

তিনি উদাহরণ হিসেবে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিল’-এর কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিলটি গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদনের পরও সেটি যথেষ্ট আগে সংসদে আসেনি।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিলটি আরও আগেই সংসদে এলে সংসদ সদস্যরা তা পড়ার এবং বিষয়টি ভালোভাবে পর্যালোচনা করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু সেটি হয়নি।

তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় কোনো আইন অনুমোদনের পর সেটি আইনসভায় পাঠানোর ক্ষেত্রে যে সময়ের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, সেটি কমানো প্রয়োজন।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—নির্বাহী বিভাগে কোনো বিল অনুমোদিত হওয়ার পর তা সংসদে পাঠাতে অযথা দেরি করা উচিত নয়। কারণ সংসদ সদস্যদের আইনটি পড়া, বুঝে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আলোচনা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন।

‘৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের হাতে পৌঁছাতে হবে’

ডেপুটি স্পিকার নির্বাহী বিভাগের প্রতি ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর যথাসময়ে বিল সংসদে আসতে হবে এবং ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের হাতে সেটি পৌঁছাতে হবে।

এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেন, শুধু সংসদীয় কমিটির সদস্যদের কাছে বিল পাঠানো যথেষ্ট নয়। আইন প্রণয়নের আগে পুরো সংসদের সদস্যদেরই বিলটি দেখার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

সংসদীয় গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এই প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

‘পরীক্ষার জন্য তো ৩৪৯ জনের কাছে যাচ্ছে না’

বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রসঙ্গেও ডেপুটি স্পিকার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বিলটি সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে—এ কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পুরো সংসদের সদস্যদের জন্য থাকে না। কমিটির মাত্র ১০ বা ১৫ জন সদস্য বিলটি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ পান।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, সংসদীয় কমিটিতে বিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে তার আগে আইনসভায় বিলটি যথাসময়ে আসাও জরুরি।

তাঁর বক্তব্য, একটি বিল সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর অর্থ এই নয় যে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য বিলটি পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছেন। তাই বিল সংসদে আসার সময় এবং তা সব সংসদ সদস্যের হাতে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বিলগুলো যাতে যথাসময়ে আইনসভায় আসে’—এটাই তাঁর অনুরোধ।

সময়সীমা নিয়ে সংসদীয় কমিটির স্বাধীনতা কতটা

বিল পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেওয়ার বিষয়টি এ আলোচনায় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব হলো বিলের বিভিন্ন ধারা পরীক্ষা করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নেওয়া এবং বিলের প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পরিবর্তনের বিষয়ে সংসদকে সুপারিশ করা।

কোনো বিল জটিল হলে কমিটির সদস্যদের আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে আইনটির সঙ্গে নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলা বা প্রশাসনিক ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত থাকলে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।

নাজিবুর রহমানের আপত্তির মূল জায়গাটি ছিল সেখানেই। তাঁর মতে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সংসদীয় কমিটির স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত করতে পারে।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইনগুলো পাস করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফলে সংসদের নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কমিটিকে দ্রুত কাজ শেষ করতে বলা হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত দুই কার্যদিবসের সময়ই নির্ধারিত

আলোচনা ও আপত্তির পর এপিবিএন বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত বিল সংসদে পাঠানোর ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ একটি বিল শুধু সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আইন হয়ে যায় না। সেটি সংসদে উত্থাপন, সদস্যদের হাতে পৌঁছানো, আলোচনা, সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের মধ্য দিয়ে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া না হলে বিলের প্রতিটি ধারা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সময়ের গুরুত্ব

এপিবিএন বিল নিয়ে বৃহস্পতিবারের আলোচনায় তাই শুধু বিলটির বিষয়বস্তু নয়, আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটিও সামনে এসেছে।

সরকার দ্রুত আইন পাস করতে চাইলেও সংসদ সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং সংসদীয় কমিটিকে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের বক্তব্যে মূলত সেই বিষয়টিই উঠে এসেছে। তাঁর মতে, মন্ত্রিসভায় কোনো বিল অনুমোদিত হওয়ার পর তা যত দ্রুত সম্ভব সংসদে পাঠানো উচিত, যাতে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যই আইনটি হাতে পান এবং পর্যাপ্ত সময় নিয়ে সেটি পড়তে পারেন।

অন্যদিকে সংসদীয় কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেওয়ার বিষয়ে যে আপত্তি উঠেছে, তা থেকেও বোঝা যায়—দ্রুত আইন পাসের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি আইনটির গুণগত পর্যালোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে।

এখন এপিবিএন বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কী ধরনের সুপারিশসহ সংসদে ফিরে আসে, সেটিই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে ডেপুটি স্পিকারের তাগিদ অনুযায়ী ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত বিলগুলো আরও দ্রুত সংসদ সদস্যদের হাতে পৌঁছায় কি না, সেটিও সংসদীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স