ঢাকা

‘যত চোর নিয়ে বিদেশে গেছেন, সবাইকে দেশে নিয়ে আসেন’: গয়েশ্বর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, বিদেশে চলে যাওয়ার পরিবর্তে দেশে ফিরে আসতে হবে এবং জনগণের মুখোমুখি হতে হবে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে রাজশাহী বিভাগীয় জিয়া মঞ্চের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আপনি আসেন, আপনি কেন দেশের বাইরে থাকবেন? আপনি যত চোর নিয়ে বিদেশে গেছেন, সব চোর নিয়ে একবারে ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশে আসেন। জনগণ আপনাদের দেখতে চায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ কেউ অপেক্ষা করছে, আবার আসিব ফিরে। আমার আপা ঘন ঘন আওয়াজ দেন, তিনি আসবেন। সাহস থাকলে আসিয়া পড়েন, আসিয়া পড়েন।’

জনগণের কথা শুনতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান

বিএনপির নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে ছিলেন, তাঁদের এখন তৃণমূলের মানুষের কথা আরও বেশি শুনতে হবে।

সাধারণ মানুষ কী চান, তাঁদের কী ধরনের অভাব রয়েছে এবং কীভাবে সেই অভাব দূর করা যায়—এসব বিষয়ে নেতা-কর্মীদের ধারণা থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গয়েশ্বর বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দূরে সরে গেলে ভুল করার আশঙ্কা বাড়ে। তাই জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে তাঁদের প্রত্যাশা ও সমস্যাগুলো বোঝার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

‘ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে, তবে ষড়যন্ত্র চলছে’

জিয়া মঞ্চের উত্থান প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে অনেক সক্রিয় নেতা-কর্মী পদবঞ্চিত হয়েছেন। তাঁদের একটি অংশ জিয়া মঞ্চে এসে সংগঠিত হয়েছেন।

তাঁর ভাষ্য, জিয়া মঞ্চ রাজপথের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত হওয়ার একটি জায়গা তৈরি করেছে।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গয়েশ্বর বলেন, ষড়যন্ত্র এখনও চলমান। ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে এবং জনগণের আস্থা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তবে সরকার গঠনকে তিনি শুধু ক্ষমতা অর্জনের বিষয় হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে বড় দায়িত্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, জনগণের আস্থা নিয়ে সরকার গঠন করা অনেক দায়িত্বশীলতার ব্যাপার। এই আস্থা ধরে রাখতে হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে।

‘প্রশাসনে আওয়ামী ভূত রয়েছে’

বর্তমান প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রশাসনের মধ্যে ‘আওয়ামী ভূত’ পেয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের ভেতরে গুপ্তচরও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর মতে, প্রশাসন এখনও পুরোপুরি পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি। পেশাদারত্বের অভাবের কারণে এই প্রশাসন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ভালো কাজ করা কঠিন।

তবে শুধু আগের সরকারের ব্যর্থতা ও রেখে যাওয়া সংকটের কথা বলে জনগণকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রাখা যাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

গয়েশ্বর বলেন, অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রশাসনে পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা বর্তমান সরকারের বড় দায়িত্ব। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

‘৩১ দফা এখন ১৮ কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা’

বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তাঁর দাবি, ৩১ দফা এখন শুধু বিএনপি বা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কর্মসূচি নয়। এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, জনগণ ৩১ দফার ওপর আস্থা রেখে একটি সুন্দর, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখতে চায়। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দল ও নেতা-কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ধৈর্য ধরার আহ্বান

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, আগের সরকারের কাছ থেকে দুর্নীতি, ঋণের বোঝা এবং নানা ধরনের সংকট উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া গেছে।

এসব সমস্যা একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারকে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিতে বলেন।

দলের নেতা-কর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন গয়েশ্বর।

তিনি বলেন, ‘১৭ বছর যদি কষ্ট করে থাকি, আরও তিনটা বছর কষ্ট করি। আমার যে অর্থ প্রয়োজন হবে পাঁচ বছরে, সেই অর্থ যেন পাঁচ দিনে উপার্জন করার চেষ্টা না করি।’

বাঁকা পথে অর্থ উপার্জনের চিন্তা বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অনৈতিকভাবে সম্পদ অর্জনের মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধের তাগিদ

দুর্নীতি বন্ধ এবং রাষ্ট্রীয় খাতে অপচয় রোধের ওপরও গুরুত্ব দেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তাঁর ভাষ্য, দুর্নীতি শুধু দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, রাজনীতিকেও কলঙ্কিত করেছে।

তাই সরকারি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গয়েশ্বর বলেন, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নিজেদের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ না করলে রাজনৈতিকভাবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিরোধী জোটের লং মার্চ নিয়েও কটাক্ষ

গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লং মার্চের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

এই কর্মসূচি নিয়েও বক্তব্য দেন গয়েশ্বর। তিনি বলেন, শুধু শেখ হাসিনার ব্যর্থতার কথা বলে জনগণকে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রাখা যাবে না। জনগণ একসময় অসন্তুষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, ‘শুধু হাসিনার ব্যর্থতার কথা বলে জনগণ বেশি দিন অপেক্ষা করবে না। জনগণ রুষ্ট হবে, তারা অভিমান করবে আমাদের ওপর।’

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের লং মার্চ নিয়ে কটাক্ষ করে গয়েশ্বর বলেন, ‘সে কারণে ওরা আগামীকাল লংমার্চ করবে। কিসের? আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, ওরা যে বেহেশতে যাওয়ার জন্য টিকিট বিক্রি করছে মানুষের সামনে, এখন বেহেশতটা কোথায়—সেই ঠিকানা খোঁজার জন্য বোধ হয় লংমার্চ করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলব, আল্লাহ তাদের ইচ্ছা যেন কবুল করেন। তারা যেন যায়।’

সাগর–রুনি হত্যার তদন্তের দাবি

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও উঠে আসে গয়েশ্বরের বক্তব্যে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটিত না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সামনে এসেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা জানতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা প্রয়োজন।

রাজশাহীতে জিয়া মঞ্চের সম্মেলন

শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে রাজশাহী বিভাগীয় জিয়া মঞ্চের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহিন শওকত। উদ্বোধক ছিলেন জিয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ্ ইকবাল।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. মামুন অর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমানসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

সম্মেলনে বিএনপি ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি রাজশাহী বিভাগীয় জিয়া মঞ্চের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের কথায় একদিকে সাবেক সরকারের সমালোচনা, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার আহ্বান এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটের কর্মসূচি নিয়ে কটাক্ষ উঠে আসে। অন্যদিকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত থাকা, দুর্নীতি থেকে দূরে থাকা এবং বর্তমান সরকারের সামনে থাকা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপরও জোর দেন তিনি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স