ঢাকা

‘সংকট সমাধান করতে না পারলে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত’—ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশে বিদ্যমান গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন সংকট সমাধান করতে না পারলে সরকারের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাষ্ট্রের গুরুতর সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে এক ধরনের গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। সংকটের জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে সরকার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের সরকারের ওপর দায় চাপিয়েও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আয়োজিত এক সমাবেশে এসব কথা বলেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসংকট এবং মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা এ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে।

‘শুধু দুঃখ প্রকাশ করলে হবে না’

সমাবেশে গাজী আতাউর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংকট নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সাংবাদিকদের সামনে এসে শুধু দুঃখ প্রকাশ করছেন। কিন্তু দেশকে সংকটে ফেলে শুধু দুঃখ প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না।

তিনি বলেন, ‘দেশকে সংকটে ফেলে শুধু দুঃখ প্রকাশ করলে হবে না। সমাধান করতে না পারলে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত।’

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিবের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের সরকারের ওপর দায় দিয়ে বর্তমান সরকারও নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সংকটের পেছনে অতীতের সিদ্ধান্ত কিংবা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও তা দেখিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

নির্বাচনের ছয় মাস পরও স্বস্তি ফেরেনি: আতাউর রহমান

গাজী আতাউর রহমান বলেন, নির্বাচনের পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের কোনো সংকটের উল্লেখযোগ্য উত্তরণ ঘটেনি। বরং জনগণ একের পর এক নতুন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।

তিনি বলেন, সরকার এমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি, যার মাধ্যমে জনগণ আশ্বস্ত হতে পারেন। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও জ্বালানি সরবরাহের নানা সমস্যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

তাঁর ভাষ্য, জনগণ সরকারের কাছ থেকে সমস্যার সমাধান ও স্বস্তি আশা করে। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের পরিবর্তে নানা ধরনের কারণ দেখানো হলে মানুষের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে।

জ্বালানি সংকটে শিল্পোৎপাদনে ধসের অভিযোগ

দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পোৎপাদনে ধস নেমেছে। এর ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়ছেন।

গাজী আতাউর রহমানের অভিযোগ, শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে। উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়বে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট শুধু শিল্প খাতের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়টি জড়িত।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন আতাউর রহমান। তাঁর দাবি, বিদ্যুতের সমস্যার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে গ্যাসের সংকটে বাসাবাড়িতে রান্না ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি সমস্যার সঙ্গে আরেকটি সমস্যা যুক্ত হয়ে সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে পরিবার থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে।

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই; এর সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত প্রভাবও রয়েছে।

বেকারত্বের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার অবনতির সম্পর্ক দেখছেন আতাউর

বেকারত্ব বাড়ার কারণে চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন গাজী আতাউর রহমান।

তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের সংকট ও মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা নগরজীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টিও যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।

তাঁর মতে, মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি এর সামাজিক প্রভাবও কিছুটা কমানো সম্ভব। তাই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকেও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

‘রাষ্ট্রের সংকট সমাধান হতেই হবে’

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফও সরকারের প্রতি সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, রাষ্ট্রের সংকট সমাধান হতেই হবে। সংকটের কারণ যা–ই হোক না কেন, রাষ্ট্রের সংকট সমাধান করাই সরকারের কাজ। দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।’

শেখ ফজলুল করীম মারুফ আরও বলেন, কোনো মন্ত্রী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে সক্ষম না হন, তাহলে তাঁর পরিবর্তে যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘সমস্যার সমাধান করতে না পারলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের স্থলে যোগ্যদের দায়িত্ব দিন।’

সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল থেকে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসংকটের দ্রুত সমাধান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

নেতারা বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ এবং পানির সংকট নিরসনে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাদের বক্তব্যে মূলত রাষ্ট্রের বিদ্যমান সংকটগুলোর জন্য কারণ ব্যাখ্যার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত সমাধান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের কাছে জবাবদিহি করে সমস্যাগুলোর সমাধান করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব—এমন অবস্থান তুলে ধরেন তাঁরা।

সমাবেশ শেষে নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। এতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স