ঢাকা

ইরানে হামলার হুমকি আরও জোরালো করলেন ট্রাম্প, নিশানায় ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
তথ্যসূত্র: আনাদোলু, ইস্তাম্বুল

ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ভূগর্ভস্থ একটি স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বতে শিগগিরই হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র—এমন হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে নয়, বরং বিরতি দিয়ে দিয়ে ইরানে হামলা চালাচ্ছে। চলমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধ’ বলা যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘সামরিক সংঘাত’ শব্দটি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলেও জানান।

সংঘাতকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ বললেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক সংঘাতের ব্যাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, অনেকেই এটিকে যুদ্ধ বলতে চান না। তিনিও এটিকে ‘সামরিক সংঘাত’ হিসেবে অভিহিত করতে পছন্দ করেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘অনেকেই এটিকে যুদ্ধ বলেন না। আমিও এটিকে সামরিক সংঘাত বলি। কারণ, এটি আমাদের জন্য ছোটখাটো বিষয়। এটি বড় কোনো ব্যাপার নয়।’

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বিরতি দিয়ে দিয়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। তাঁর দাবি, সম্প্রতি ইরানের রাডারব্যবস্থায় হামলা চালানোর আগে কয়েক দিন সেখানে সক্রিয় কোনো লড়াই হয়নি।

‘আমরা এখন লড়াই করছি না। কোনো লড়াই হচ্ছে না’—বলেন ট্রাম্প।

তবে একই সময়ে তিনি জানান, ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

হরমুজে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কিছু সামরিক ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।

তাঁর ভাষ্য, হরমুজ প্রণালির সুরক্ষায় থাকা ইরানের রাডার, উড়োজাহাজ এবং অন্যান্য সামরিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে মাইন অপসারণকারী জাহাজ ব্যবহার করে প্রণালিটির বিভিন্ন এলাকায় থাকা মাইনও সরানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। ফলে এ জলপথে সামরিক তৎপরতা বাড়ার বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‘ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রেখেছি’

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রেখেছে। এর ফলে ইসরায়েলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য নিরাপদ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। আমরা সেটিই করেছি। ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। কারণ, তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে আপনারা হয়তো আর এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না।’

এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

‘খুব শিগগির পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাতে পারি’

এরপর ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স’ পর্বত নিয়ে সরাসরি হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, সেখানে খুব শিগগিরই হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

তিনি বলেন, ‘আমরা খুব শিগগির পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাতে পারি।’

পিকঅ্যাক্সসহ ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কারা চলাফেরা করছে এবং সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে—সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প।

তাঁর এই বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ ও অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর ওপরও যুক্তরাষ্ট্র নজর রাখছে এবং প্রয়োজনে সেগুলোকে সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘পিকঅ্যাক্স’?

আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পিকঅ্যাক্স পর্বত ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়ের শত শত মিটার পুরু গ্রানাইট স্তরের নিচে সেখানে দুটি টানেল কমপ্লেক্স রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে। তবে ইরানের বক্তব্য ভিন্ন। তেহরানের দাবি, স্থাপনাটি মূলত উন্নত সেন্ট্রিফিউজ তৈরি ও সংযোজনের কাজে ব্যবহৃত হয়।

স্থাপনাটি অত্যন্ত গভীরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো কঠিন বলে ধারণা করা হয়। আর এ কারণেই পিকঅ্যাক্স যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

ভূগর্ভের গভীরে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে কোনো স্থাপনা থাকলে সেটিতে হামলা চালানোর জন্য সাধারণ আকাশ হামলার তুলনায় আরও শক্তিশালী ও নির্দিষ্ট সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পিকঅ্যাক্সে হামলার হুমকি ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সংঘাত কবে শেষ হবে, জানালেন না ট্রাম্প

চলমান সামরিক সংঘাত কবে শেষ হতে পারে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি ট্রাম্প।

তবে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন করেছে। তাঁর ভাষ্য, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না—এটাই ছিল সবচেয়ে বড় বিষয়।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয়টি অর্জন করেছি—ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’

অর্থাৎ সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির কোনো সময়সূচি না দিলেও ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে, ওয়াশিংটন তার ঘোষিত প্রধান সামরিক লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে মনে করছে।

‘পুনর্গঠনে ইরানের ২৫ বছর লাগবে’

ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনই সামরিকভাবে সরে গেলেও তেহরানের পক্ষে তার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা সহজ হবে না বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।

তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র অভিযান বন্ধ করে ইরান থেকে সরে গেলেও দেশটির অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে তেহরানের প্রায় ২৫ বছর সময় লাগতে পারে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য মূলত ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রভাব সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন তুলে ধরে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সামরিক অভিযান শেষ হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইরানের ওপর থাকবে।

পিকঅ্যাক্সে হামলার হুমকিতে নতুন করে উত্তেজনা

ট্রাম্পের ‘পিকঅ্যাক্সে’ শিগগির হামলার হুমকি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্থাপনাটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের যে ধারণার কথা আল–জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাৎপর্যপূর্ণ ওই স্থাপনায় হামলা হলে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্প একদিকে সংঘাতকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করলেও অন্যদিকে ইরানের সামরিক অবকাঠামো, হরমুজ প্রণালি এবং পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যে সামরিক অভিযান সীমিত রাখার বার্তার পাশাপাশি প্রয়োজনে নতুন হামলার প্রস্তুতির ইঙ্গিতও রয়েছে।

বিশেষ করে পিকঅ্যাক্সের মতো গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলার হুমকি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। তবে সংঘাতের শেষ কোথায় এবং যুক্তরাষ্ট্র আদৌ পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাবে কি না—এ বিষয়ে ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা পরিকল্পনা জানাননি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স