প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে আটক গাজীপুরের তরুণ সিফাত আবদুল্লাহকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসক ও তরুণ রাজনীতিক তাসনিম জারা।
সিফাতের ব্যবহৃত ভাষা অশোভন ছিল—এ বিষয়টি স্বীকার করেও তাসনিম জারা প্রশ্ন তুলেছেন, কেবল গালিগালাজ বা অভদ্র ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে কেন তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হলো।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তাসনিম জারা এসব প্রশ্ন তোলেন।
তিনি লিখেছেন, ‘সিফাতের ভাষা ভদ্র ছিল না। এটা নিয়ে তর্ক করার কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্নটা ভদ্রতার নয়। কারণ সিফাতকে অভদ্রতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়নি। মামলা দেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। তাহলে গালি দেওয়া কি সন্ত্রাস?’
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভিডিও, এরপর আটক
সিফাত আবদুল্লাহর ফেসবুক আইডিতে থাকা ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই ভিডিওতে তাঁকে বাসায় আসা বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
ভিডিওতে সিফাত দাবি করেন, চলতি মাসে তাঁর বাসায় ৪ হাজার টাকা এবং এর আগের মাসে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এসেছে।
ভিডিওতে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি কটূক্তি করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এরপর বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুর মহানগরের গাছা এলাকা থেকে সিফাতকে আটক করা হয়। পরে শুক্রবার তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
সিফাতের বিরুদ্ধে নেওয়া এই আইনি পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তাসনিম জারা।
‘গালি দেওয়া কি সন্ত্রাস?’
তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে বলেন, সিফাতের বক্তব্যের ভাষা নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু সেটিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আনার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন হলো—কোনো ব্যক্তির বক্তব্য অশোভন, আক্রমণাত্মক বা গালিগালাজপূর্ণ হলে সেটি সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে সমালোচিত হতে পারে; কিন্তু সেই বক্তব্যের জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর আইন প্রয়োগের যৌক্তিকতা কী।
তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘যাঁরা এই গ্রেপ্তারের বিপক্ষে লিখছেন, তাঁদের কমেন্ট বক্সে গালির বন্যা। সাথে বলছেন যে ছেলেটা গালি দিয়েছে, তাই ধরা ঠিক হয়েছে। আয়রনি (পরিহাস) হলো, তাঁরা নিজেরাই গালি দিয়ে সেটা বলছেন। এবং তাঁদের কোনো ভয় নাই।’
তিনি আরও বলেন, যারা সিফাতের গ্রেপ্তারকে সমর্থন করছেন, তাঁদের নিজেদের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে।
ক্ষমতাসীনদের গালি দিলে এক আইন, অন্যদের দিলে আরেক?
তাসনিম জারার অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অবস্থান অনুযায়ী অনেকের কাছে গালিগালাজের গ্রহণযোগ্যতা বদলে যায়।
তিনি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘কারণ তাঁরা জানেন গালিটা তাঁরা কাকে দিচ্ছেন, আর কাকে দিচ্ছেন না। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন কাউকে গালি দিলে সেটা অপরাধ, ক্ষমতায় না থাকা কাউকে দিলে সেটা গ্রহণযোগ্য।’
তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ তুলেছেন।
তাসনিম জারার মতে, মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যবস্থা থাকা উচিত নয়, যেখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সমালোচনা বা কটূক্তিকে একভাবে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের একই ধরনের বক্তব্যকে অন্যভাবে দেখা হবে।
সরকারের কাছে ‘তালিকা’ চাইলেন তাসনিম জারা
সিফাতের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে সরকারকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে একটি ‘তালিকা’ প্রকাশের আহ্বান জানান তাসনিম জারা।
তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা একটা তালিকা করে দিন। কী কী লিখলে, কী কী আঁকলে, বিলের কাগজ হাতে নিয়ে কী কী বললে রাত সাড়ে আটটায় দরজায় পুলিশ আসবে না। লিখে দিন। আমরা মেনে চলব।’
এরপর তিনি সরকারের উদ্দেশে আরও বলেন, যদি এমন তালিকা দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সরকারেরই নিজেদের সংযত করা উচিত।
এ প্রসঙ্গে তিনি ‘দ্য ডিক্টেটর’ সিনেমার আলাদিনের আচরণের উদাহরণ টেনে লেখেন, ‘আর যদি তালিকা দিতে অস্বস্তি হয়, “দ্য ডিক্টেটর” সিনেমার আলাদিনের আচরণের মতো মনে হয়, তাহলে নিজেদের সংযত করুন।’
তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত সরকারের সমালোচনা ও নাগরিকের মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সিফাতের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি
সিফাত আবদুল্লাহর অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তাসনিম জারা। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাও প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তাসনিম জারা বলেন, ‘মামলা প্রত্যাহার করুন। আর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে ধারাগুলো কথা বলার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়, সেগুলো সংশোধন করুন।’
তাঁর দাবি, কথা বলা বা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কোনো ধারা ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক
সিফাত আবদুল্লাহকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
একদিকে সিফাতের ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা আইনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাসনিম জারাসহ সমালোচকেরা।
তাসনিম জারার বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো—কোনো বক্তব্যের ভাষা অশোভন হলে তার বিরুদ্ধে সামাজিক, রাজনৈতিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে; কিন্তু অভিযোগের ধরন ও প্রয়োগ করা আইনের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর আইনে মামলা করার ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রকৃতি ও আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সিফাতের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কোন কোন ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে এবং তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য—এসব বিষয়ও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।