প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর হুইলচেয়ারে করে জাতীয় সংসদে যোগ দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস। গুরুতর অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার তিনি প্রথমবারের মতো সংসদের অধিবেশনে উপস্থিত হন।
শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, তাঁর চিকিৎসা এখনো চলছে এবং তিনি পুনর্বাসন চিকিৎসার (রিহ্যাব) মধ্যে রয়েছেন। তবে সংসদে সহকর্মীদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতার কারণে চিকিৎসার মাঝপথেই তাঁকে সংসদে ফিরতে হয়েছে।
সংসদে তাঁর বক্তব্যের সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তিনি নিজের আসনে যেতে পারেননি। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের দুই সারির মাঝের চলাচলের পথে হুইলচেয়ারে বসেই বক্তব্য দেন। এ সময় বিএনপির সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমান পাশের আসন থেকে তাঁকে বক্তব্য দিতে সহযোগিতা করেন। মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের সময় সংসদে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অনেককেই এ সময় আবেগতাড়িত দেখা যায়।
গুরুতর স্ট্রোকের পর দীর্ঘ চিকিৎসা
নিজের অসুস্থতার প্রসঙ্গ তুলে মির্জা আব্বাস বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পরপরই একটি সভায় তিনি গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁকে দীর্ঘ সময় সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বর্তমানে তিনি রিহ্যাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে সংসদে নিয়মিত উপস্থিত হওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেই এবার প্রথমবারের মতো সংসদের অধিবেশনে যোগ দিতে পেরে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা।
অসুস্থতার কঠিন সময়ে যাঁরা তাঁর জন্য দোয়া করেছেন, নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন এবং পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
‘এর চেয়ে আনন্দ ও গর্বের মুহূর্ত আর কী হতে পারে’
সংসদে ফিরে আসার দিনটিকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত আবেগঘন ও চিরস্মরণীয় একটি দিন হিসেবে উল্লেখ করেন মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন, ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পেরিয়ে আবার জাতীয় সংসদের এই কক্ষে সংসদ সদস্য হিসেবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। এত দীর্ঘ সময় পর সংসদে ফিরে আসাকে জীবনের বিশেষ এক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন—এর চেয়ে আনন্দ ও গর্বের মুহূর্ত আর কী হতে পারে?
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতার পর আবার সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ পাওয়াকে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় বলে উল্লেখ করেন। অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংসদীয় কার্যক্রম থেকে দূরে থাকতে হলেও মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয় তাঁর মধ্যে অটুট রয়েছে বলেও বক্তব্যে তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা
অসুস্থতার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান মির্জা আব্বাস।
বিশেষভাবে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। মির্জা আব্বাস জানান, অসুস্থ অবস্থায় স্পিকার নিজে সিঙ্গাপুরে গিয়ে তাঁকে দেখে এসেছিলেন।
তখন তিনি অচেতন থাকায় স্পিকারকে দেখতে পারেননি। পরে বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। একজন সংসদ সদস্য অসুস্থ হয়ে বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার সময় স্পিকারের এভাবে পাশে দাঁড়ানো তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে বলে জানান মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যের প্রতি স্পিকারের এই মানবিক আচরণ শুধু একজন অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতার প্রকাশ নয়; এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের মানবিক সৌন্দর্যেরও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন মানুষ হিসেবে যে মমত্ববোধ তিনি দেখিয়েছেন, তা কোনো দিন ভুলবেন না বলেও জানান বিএনপির এই নেতা।
‘রাজনীতি মানুষের জন্য’
সংসদে ফিরে রাজনীতি ও জনসেবা সম্পর্কে নিজের উপলব্ধির কথাও তুলে ধরেন মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন, জাতীয় রাজনীতি শুধু মতপার্থক্যের বিষয় নয়; রাজনীতি মানুষের জন্য। একইভাবে সংসদ শুধু সংসদ সদস্যদের জন্য নয়, এটি দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
নিজের রাজনৈতিক প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমি ফিরে এসেছি মানুষের কাছে, মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করার জন্য।’
আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষ এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চান বলে জানান তিনি। জীবনের বাকি সময়টুকু নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে রাজনীতি ও জনসেবায় ব্যয় করার সুযোগ দিতে সবার কাছে দোয়া চান।
দলমত–নির্বিশেষে শুভকামনার জন্য কৃতজ্ঞতা
অসুস্থতার সময় দলমত–নির্বিশেষে যাঁরা তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন, অনেকে তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া করেছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শুভকামনা জানিয়েছেন। কঠিন সময়ে মানুষের এই ভালোবাসা, শুভকামনা ও দোয়া তাঁকে সাহস জুগিয়েছে।
দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে হুইলচেয়ারে হলেও সংসদে ফিরে আসার দিনটিকে তাই শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, রাজনৈতিক জীবনেও একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন মির্জা আব্বাস। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংসদে উপস্থিত হয়ে মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বাকি সময় দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।