দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে জুনের পর থেকে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। অনেক জায়গায় শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তিন মাসেই সংক্রমণের বড় উল্লম্ফন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৪৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১১১ জন।
জুনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম চার দিনেও আক্রান্তের হার কমেনি।
তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩৩ হাজার ৩০৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৩০ জনের। ২০২৪ সালের একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৩২৫ জন এবং মারা যান ৯৯ জন।
তবে এসব সরকারি পরিসংখ্যানে মূলত হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের হিসাব থাকে। যারা হালকা উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন কিংবা হাসপাতালে যাচ্ছেন না, তারা এই হিসাবের বাইরে।
ডেঙ্গুর দুই সেরোটাইপ নিয়ে নতুন শঙ্কা
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান সেরোটাইপ হলো ডেন–১, ডেন–২, ডেন–৩ এবং ডেন–৪। একবার কোনো একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সাধারণত সেই ধরনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে। কিন্তু অন্য সেরোটাইপের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুরক্ষা সবসময় পাওয়া যায় না।
ফলে আগে এক ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চলতি বছর পরিস্থিতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ডেন–৩ সার্বিকভাবে বেশি পাওয়া গেলেও ডেন–২-ও উল্লেখযোগ্যভাবে ছড়াচ্ছে। ফলে দেশে একই সময়ে দুই সেরোটাইপের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সীমিত নমুনা পরীক্ষায় এই চিত্র উঠে এসেছে। বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে চালানো পরীক্ষায় শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যেও সেরোটাইপের পার্থক্য পাওয়া গেছে।
বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহর এলাকায় ডেন–৩ বেশি পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট গ্রামাঞ্চলে ডেন–২-এর উপস্থিতি বেশি ছিল। বান্দরবানেও ডেন–২ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, মাত্র তিন জেলার নমুনার ভিত্তিতে পুরো দেশের পরিস্থিতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এতে বোঝা যাচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে একটি সেরোটাইপ প্রাধান্য পেলেও বিভিন্ন অঞ্চল এবং শহর-গ্রামে পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।
২০২৩ সালের পর আবার বড় ঢেউয়ের আশঙ্কা
বাংলাদেশে ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান।
বড় ধরনের সংক্রমণের পর সাধারণত জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হয়। ফলে পরের বছর একই মাত্রার সংক্রমণ নাও হতে পারে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও এমন পরিস্থিতিই দেখা গিয়েছিল।
কিন্তু চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে চিত্র পাল্টে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সেপ্টেম্বরেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং বছরের শেষদিকে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
মশা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানোর অন্যতম প্রধান উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় তৎপরতা চোখে পড়ছে না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আগস্টের মশা জরিপে বিভিন্ন প্রজননস্থলে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পাওয়া গেছে। ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ড্রেন, বেজমেন্ট, পানির ট্যাংক ও ফেলে রাখা বিভিন্ন পাত্রে মশার লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।
এডিস মশার ঘনত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত ব্রুটো ইনডেক্সের সর্বোচ্চ মান পাওয়া গেছে ৪০ দশমিক ৩৩ পর্যন্ত।
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ঢাকার বাইরের অনেক এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ। কিছু এলাকায় ব্রুটো ইনডেক্স ৪০-এর ওপরে থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, শুধু হাসপাতাল বাড়ানো কিংবা রোগীর চিকিৎসার প্রস্তুতি নিলে ডেঙ্গুর উৎস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, ধ্বংস এবং নিয়মিত নজরদারি করতে হবে।
ঢাকার বাইরেও দ্রুত ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও এর বিস্তার ঘটেছে।
চলতি বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ৪৮ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের বড় অংশই রাজধানীর বাইরে।
বান্দরবানের প্রত্যন্ত রোয়াংছড়ির মতো এলাকাতেও ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে দুর্গম ও গ্রামীণ এলাকায় রোগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকার বাইরে সমস্যা আরও জটিল হওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দুটি বিষয় উল্লেখ করছেন—মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চিকিৎসাসুবিধার সীমাবদ্ধতা।
খুলনাতেও এমন পরিস্থিতির উদাহরণ পাওয়া গেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোগীর পরিবার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ঘুরেও তাৎক্ষণিকভাবে শয্যা পায়নি। শেষ পর্যন্ত কয়েক দিন পর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শয্যার ব্যবস্থা হয়।
খুলনা ও চট্টগ্রামে বাড়তি চাপ
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রামে—১০৯ জন।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বাদ দিলে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে খুলনা বিভাগে। এ বিভাগে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৩২৪ জন এবং মারা গেছেন ১৯ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বর্তমান বিস্তারকে শুধু রাজধানীর সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। অঞ্চলভেদে কোন সেরোটাইপ ছড়াচ্ছে, কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি এবং কোথায় চিকিৎসা অবকাঠামো দুর্বল—এসব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সার্বিকভাবে, ডেন–২ ও ডেন–৩-এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য কোনো সেরোটাইপ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করছে। তাই সেপ্টেম্বর ও বছরের শেষভাগে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই মশা নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও চিকিৎসাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।