জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দেশ ও বিদেশে ১৪ দফা অস্ত্রোপচার করিয়েও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি মো. শাকিল আহমেদ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে নিজের শারীরিক দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন ডাইলেশন পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁকে মলত্যাগ করতে হয়।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ শাকিল আহমেদ সাক্ষ্য দেন। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে করা মামলায় তিনি সাক্ষী। তিনি ‘ক’ গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা। আন্দোলনের সময় তিনি শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
মামলার দুই আসামি আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রোববার তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা
জবানবন্দিতে শাকিল জানান, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে তিনি মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেন। সেখানে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছিল বলে তিনি দেখতে পান।
প্রাণ বাঁচাতে তিনি ফুটপাতে থাকা হকারদের একটি খাটের নিচে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দ শুনে পেছনে তাকিয়ে একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। আহত ব্যক্তিকে সাহায্য করতে খাটের নিচ থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর শরীরেও গুলি লাগে।
দেশ-বিদেশে ১৪ অস্ত্রোপচার
শাকিল বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর ৮ আগস্ট কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। সেখানে পাঁচটি অস্ত্রোপচার হয়। এরপর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা নেন তিনি।
চিকিৎসকদের পরামর্শে পরে তাঁকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। সেখানে ছয় মাসের চিকিৎসাকালে আরও নয়বার অস্ত্রোপচার করা হয়। সব মিলিয়ে ১৪টি অস্ত্রোপচারের পরও তাঁর শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়নি।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন ডাইলেশন করে মলত্যাগ করতে হয়। মিষ্টিজাতীয় খাবার তাঁর জন্য নিষিদ্ধ। ডায়াবেটিস হলে পা কেটে ফেলার আশঙ্কার কথাও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। শক্ত খাবার খেতে পারেন না; তাঁকে মূলত তরল খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
কারফিউ দেওয়ার পেছনে আনিসুল-সালমানের ভূমিকার অভিযোগ
জবানবন্দিতে শাকিল আরও অভিযোগ করেন, আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্দোলন দমনে ‘কুপরামর্শ’ দিয়েছিলেন। তাঁদের পরামর্শেই শেখ হাসিনা কারফিউ দিতে সম্মত হন বলে তাঁর দাবি।
শাকিলের ভাষ্য অনুযায়ী, কারফিউ জারির পর পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর সুযোগ পায়।
কামরুলের ‘পেটোয়া বাহিনীর’ গুলিতে সাইফুল্লাহ নিহতের অভিযোগ
গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় রোববার জবানবন্দি দিয়েছেন আন্দোলনকারী মো. জাকির হোসেন। মামলাটিতে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
জাকির জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেল তিনটার দিকে আজিমপুর মেয়র হানিফ জামে মসজিদের সামনে গিয়ে তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের লোকজনকে গুলি চালাতে দেখেন।
প্রাণ বাঁচাতে তিনি ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বিপরীতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের তৃতীয় তলায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকে দক্ষিণের একটি গলিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে অবস্থান করতে দেখেন বলে জানান তিনি।
জাকিরের দাবি, তাঁদের অনেকে পুলিশের সঙ্গে অবস্থান করে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাচ্ছিলেন। ওই সময় আশরাফুল ও খালেদ সাইফুল্লাহসহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক খালেদ সাইফুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন বলে তিনি জানান।
জাকির আরও বলেন, তাঁর ছেলে ইফতিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছাত্রলীগের কয়েকজন তুলে নিয়ে নির্যাতন করে। রাত ১১টার দিকে তাঁর দুই বন্ধু ইফতিকে বাসায় পৌঁছে দেন।
মেনন ও কামরুল ইসলামকেও রোববার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
দুই ছাত্রদল ও জাসাস নেতাকে ক্রসফায়ারে হত্যার মামলায় সাক্ষ্য
২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের আগৈলঝাড়ায় উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগের মামলায়ও রোববার সাক্ষ্য দেন মো. শহিদুল ইসলাম।
তিনি ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বরিশাল জেলা পুলিশ লাইনসের মোটরযান শাখায় কর্মরত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল–২–এ দেওয়া জবানবন্দিতে শহিদুল বলেন, ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে পুলিশ লাইনসের মোটরযান শাখায় গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চালক ও দেহরক্ষীদের কাছ থেকে আগের রাতে আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় দুটি ক্রসফায়ারের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগৈলঝাড়া থানার এএসআই রাজু তাঁকে জানান, উজিরপুর থেকে দুজনকে এনে এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও জসিমের মাধ্যমে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে। পরে গণমাধ্যমের খবর থেকে তিনি জানতে পারেন, নিহত দুজন হলেন কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদার।
মামুন খালেদের মামলায় প্রতিবেদন ৬ ডিসেম্বর
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুমের অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ৬ ডিসেম্বর দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল–২।
রোববার মামুন খালেদকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।