ঢাকা

সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি হুতিদের, বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি অজ্ঞাত বস্তু—ক্ষেপণাস্ত্র নাকি ড্রোন, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি—সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। এতে দুজন আহত হয়েছেন। হামলায় বেশ কয়েকটি ভবন ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের বেসামরিক সুরক্ষা বিভাগ।

তবে হামলার দায় স্বীকার করে হুতিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের শারুরাহ এলাকায় একটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ওই হামলা চালিয়েছে। ফলে হামলার প্রকৃত লক্ষ্য ও ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে হুতিদের দাবির পার্থক্য দেখা দিয়েছে।

জাজানে আঘাত, আহত দুজন

আল-জাজানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার জাজান অঞ্চলের আল-তুওয়াল গভর্নরেটে হুতিদের ছোড়া অজ্ঞাত বস্তুটি আঘাত হানে। এর পরপরই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্ধারিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে সৌদি বেসামরিক সুরক্ষা বিভাগ।

সৌদি বেসামরিক সুরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র জানান, হামলায় দুজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকটি ভবন ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মুখপাত্র আরও বলেন, বেসামরিক স্থাপনায় যেকোনো ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। তবে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত পরিমাণ বা অজ্ঞাত বস্তুটি কীভাবে প্রতিহত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি হুতিদের

সৌদি কর্তৃপক্ষ যেখানে জাজানের একটি এলাকায় হামলার ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে, সেখানে হুতিদের দাবি—তাদের লক্ষ্য ছিল নাজরান প্রদেশের শারুরাহ এলাকার একটি সামরিক ঘাঁটি।

ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী সাম্প্রতিক দিনগুলোয় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে আসছে। এসব হামলার ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করে হুতিরা। ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হন বলে জানা গেছে।

কয়েক বছর পর ফের উত্তপ্ত ইয়েমেন

ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতে সৌদি আরব দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া বিভিন্ন সমঝোতা ও যুদ্ধবিরতির আওতায় গত কয়েক বছরে দেশটির পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।

তবে গত জুলাই থেকে সেই আপাত শান্ত পরিস্থিতি আবারও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিদের ধারাবাহিক হামলা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

লোহিত সাগর উপকূল নিয়ন্ত্রণের দাবি

এদিকে হুতিরা গত শুক্রবার ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে। এর আগে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী আল-মোখা দখলের কথাও জানিয়েছে তারা।

লোহিত সাগর ও এর সঙ্গে সংযুক্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাব আল-মানদেব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হওয়ায় সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

হুতিরা এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

সরকারি বাহিনীর নতুন অভিযান

অন্যদিকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী আল-জাওফ, মারিব ও আল-বায়দা এলাকায় হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। দুই পক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে এবং বহু মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন হাজারো মানুষ। সংঘাত অব্যাহত থাকলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

‘আরও বিপজ্জনক পর্যায়ের’ সতর্কতা

ইয়েমেনের নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পরিস্থিতি নিয়ে চলতি মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধ ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ের’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ধারাবাহিক হুতি হামলা, ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযান এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধের হুমকি—সব মিলিয়ে দেশটির সংঘাত আবারও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স