অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেছে এবং ক্ষমতায় গিয়ে দেশের কোষাগার লুট করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদেশি সহায়তার অর্থসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকেও অর্থ চুরি করে ফিলিপাইনে নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রোববার বিকেলে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিএনপি ও এর সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির প্রসঙ্গ তুলে ধরে স্পিকার বলেন, ফিলিপাইনে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কারও বিচার হয়নি বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
দেশের প্রশাসন ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্পিকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর।’ তাঁর অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ ঘুষ, অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। এসব কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে নানা ধরনের দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্যায় ও অপরাধের বিচার অনেক সময় জনগণের দাবির অপেক্ষা না করেই হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মানুষ বছরের পর বছর দাবি ও আন্দোলন করেও অনেক অপরাধের বিচার পায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগ আমলে সম্পদ লুটের অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও করেন স্পিকার। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী দেশের সর্বনাশ করেছেন এবং লুটপাটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, লন্ডনে তাঁর ৩৬০টি বাড়ি পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। এ ছাড়া দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রেও তাঁর সম্পদ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন স্পিকার।
তিনি বলেন, এসব সম্পদ বাংলাদেশের জনগণের অর্থ লুট করে বিদেশে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনে এখনো আওয়ামী লীগ আমলের বেশ কিছু কর্মকর্তা রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, এ কারণে সরকারের আগের সময়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র এখনো জনগণের সামনে পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
‘বাংলাদেশ ভালো থাকুক, তা প্রতিবেশী রাষ্ট্র চায় না’
ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ ভালো থাকুক—এটা একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র চায় না। তাঁর অভিযোগ, ওই দেশ বাংলাদেশকে ‘করদ রাজ্য’ বানানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ থেকে ১৭ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের পরিবর্তে ওই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে একাধিক অসম চুক্তি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমের উদাহরণ দিয়ে স্পিকার বলেন, ভারতীয় জাহাজ বন্দরে এলে অন্য জাহাজ, এমনকি বাংলাদেশের জাহাজগুলোকেও খালি করে আগে ভারতীয় জাহাজের পণ্য খালাসের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এতে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের অপেক্ষা করতে হয় এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পরিবহনের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন স্পিকার। তিনি বলেন, এসব পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ শুল্ক দেওয়ার কথা, তা যথাযথভাবে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, বিনা শুল্কে অথবা নামমাত্র শুল্কে এসব পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সারা বিশ্বে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের সুবিধা দেওয়ায় দেশের ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সীমান্তে হত্যার অভিযোগ
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন স্পিকার। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের সীমান্তে নিয়মিত মানুষ হত্যা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভারতের পাকিস্তানের সঙ্গেও সীমান্ত রয়েছে। কিন্তু সেখানে এমনভাবে গুলি চালানোর ঘটনা দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশের সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়
তজুমদ্দিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বিএনপি ও এর সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফার সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওমর আসাদ।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি জাকির হোসেন হাওলাদার, হাসান মাকসুদুর রহমান, ভোলা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম এবং চাঁদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন জুলফিকারসহ স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
মতবিনিময় সভায় স্পিকার দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।