ঢাকা

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে ব্রিকসকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান সি চিন পিংয়ের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য ব্রিকস জোটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। গতকাল শনিবার ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর।

সি চিন পিং বলেন, এই সংঘাত নিরসন এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চীন ব্রিকসের অন্য সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্যে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ব্রিকসের ভূমিকা আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ

ব্রিকস সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন সি। তাঁর মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও যুদ্ধ কোনো পক্ষেরই অভিন্ন স্বার্থ পূরণ করে না। বরং এর প্রভাব আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে।

এ অবস্থায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। চীন ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে চায় বলেও জানান চীনা প্রেসিডেন্ট।

‘গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বদানকারী জোট’ ব্রিকস

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ২০০৯ সালে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জোটটিতে যুক্ত হয়।

উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠা ব্রিকসকে সি চিন পিং ‘গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বদানকারী জোট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আত্মনির্ভরতার একটি কার্যকর মডেল হিসেবে ব্রিকস ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোতে বসবাস করে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এই দেশগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে জোটটির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।

উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নে জোর

সম্মেলনে ব্রিকসের ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নিয়েও কথা বলেন সি চিন পিং। তিনি বলেন, উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে জোটটির আরও সক্রিয় হওয়া উচিত।

বিশেষ করে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে আরও টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করা সম্ভব বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

সি জানান, আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নেবে চীন। একই সঙ্গে ১৯তম ব্রিকস সম্মেলনেরও আয়োজন করবে দেশটি। ফলে আগামী বছর জোটটির কার্যক্রমে চীনের অগ্রাধিকার ও উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মোদির সঙ্গে সি চিন পিংয়ের বৈঠক

ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন সি চিন পিং। দীর্ঘ সাত বছর পর নয়াদিল্লিতে তাঁর সফরকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে সি চিন পিং বলেন, চীন ভারত-চীন সম্পর্ককে কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। দুই দেশ একে অপরের শক্তি ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা

চীন ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিরোধে জর্জরিত। ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর থেকেই সীমান্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে।

২০২০ সালে সীমান্তে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়। ওই ঘটনার পর সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে। সি চিন পিংয়ের নয়াদিল্লি সফর সেই প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাণিজ্যিক সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট অগ্রগতি নেই

কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা এলেও চীন ও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় ধরনের অগ্রগতির স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। সীমান্ত বিরোধসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন মতপার্থক্য দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে।

ফলে সি-মোদি বৈঠক দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা এগিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে ব্রিকসকে সক্রিয় করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে সি চিন পিং জোটটির ভূরাজনৈতিক ভূমিকা আরও বাড়ানোর পক্ষে চীনের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ব্রিকসের প্রভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকটে জোটটি কতটা সমন্বিত ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স