ঢাকা

মার্কিন অবরোধ মোকাবিলায় হরমুজে নতুন নৌপথ চালুর উদ্যোগ ইরানের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা ও নৌ অবরোধের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি নৌপথ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি চুক্তি হতে পারে। আগামীকাল সোমবার ওমানের রাজধানী মাসকটে অনুষ্ঠেয় আঞ্চলিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে এ চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর। ভারতের সম্প্রচারমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও ওমানের মধ্যে যৌথ নৌপথ চালুর বিষয়ে চুক্তি হবে এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনকেও (আইএমও) অবহিত করা হবে।

মাসকটে আঞ্চলিক বৈঠক, নৌপথ নিয়ে চুক্তির উদ্যোগ

পেজেশকিয়ান বলেন, সোমবার আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মাসকটে বৈঠকে বসবেন। সেখানে হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি যৌথ নৌপথ চালুর বিষয়ে চুক্তি সই করা হবে।

তিনি বলেন, যেসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে, সেসব দেশও বৈঠকে অংশ নেবে। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের আলোচনার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

তবে ওমানের পক্ষ থেকে বৈঠক বা চুক্তি সইয়ের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ নিয়েও ইরানের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের ওপর আরোপ করা অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, সামরিকভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তাঁর দেশ পুরোপুরি সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে নৌপথে চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করা সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পেজেশকিয়ানের ভাষ্য, সমুদ্রপথ ইরানের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন নয়। তাই নৌ অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।

অবরোধ বন্ধ হলে হরমুজ খুলে দেওয়ার বার্তা

হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা ও অবরোধ বন্ধ করলে ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে।

তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলের বিষয়টিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হিসেবে দেখছে।

অন্যদিকে নতুন নৌপথ চালুর উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত ও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে তেহরান। প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে।

উপসাগরীয় আট দেশকে নিয়ে বৈঠক

এর আগে গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছিলেন, ওমানে একটি আঞ্চলিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আটটি দেশ এতে অংশ নেবে বলে তিনি জানান।

বাঘাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের আলোচনার ফলাফলও বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।

অর্থাৎ প্রস্তাবিত নৌপথ শুধু ইরান ও ওমানের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবেও আলোচনায় আসতে পারে।

‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়’

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বাঘাই বলেন, জলপথটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান কাজ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও সামরিক হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।

তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হরমুজে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সামরিক উত্তেজনা কমানোকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে তেহরান।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণের উদ্যোগ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে করিডরের প্রবেশ ও বহির্গমনপথ

হরমুজে নতুন করিডর চালুর পরিকল্পনার বিষয়ে এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাইও বক্তব্য দিয়েছিলেন। গত সোমবার তিনি জানিয়েছিলেন, নতুন একটি করিডর চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে কয়েক দিনের মধ্যেই চুক্তি সই হতে পারে।

রেজাইয়ের দাবি, প্রস্তাবিত করিডরের প্রবেশপথ ও বের হওয়ার পথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর ফলে নতুন নৌপথের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলের ওপর তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক সমঝোতার দিকে নজর

ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রস্তাবিত নৌপথ এবং মাসকটের আঞ্চলিক বৈঠক এমন এক সময়ে হতে যাচ্ছে, যখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা চরমে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও সামরিক চাপ, অন্যদিকে ইরানের হরমুজ নিয়ন্ত্রণের অবস্থান—দুইয়ের মধ্যেই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।

এ পরিস্থিতিতে সোমবারের বৈঠকে ইরান, ওমান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কী ধরনের সমঝোতা হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। প্রস্তাবিত যৌথ নৌপথ বাস্তবে চালু হলে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে অঞ্চলটির সামরিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কতটা কমে তার ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স