বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মানের রত্ন জেড, বিশেষ করে উজ্জ্বল সবুজ ‘ইম্পেরিয়াল জেড’, আসে মিয়ানমার থেকে। চীনে বহু শতাব্দী ধরে বিরল এই রত্নকে বলা হয় ‘স্বর্গের পাথর’। শুধু জেড নয়—সোনা, টিন ও ভারী বিরল মৃত্তিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজেরও বড় মজুত রয়েছে দেশটিতে।
এসব খনিজের খনি ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, তার হাতে থাকে বিপুল অর্থের উৎস। আর মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে এই অর্থ অস্ত্র কেনা, যোদ্ধাদের অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে খনিজ সম্পদ দেশটির সংঘাতের মূল কারণ না হলেও যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার অন্যতম অর্থনৈতিক ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
ইলেকট্রিক গাড়ি ও বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার, অলংকার ও ক্ষেপণাস্ত্র—আধুনিক বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্প নানা ধরনের খনিজের ওপর নির্ভরশীল। মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে উত্তোলিত এসব খনিজ এখন আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
‘দ্য ক্রিটিক্যাল মিনারেলস লিংকিং মিয়ানমারস সিভিল ওয়ার টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের এক ভিজ্যুয়াল অনুসন্ধানে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) গত বৃহস্পতিবার তাদের ওয়েবসাইটে অনুসন্ধানটি প্রকাশ করে।
মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি উপগ্রহচিত্র, সংঘাতের উপাত্ত, খনি এলাকার রাতের আলো, আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে আইসিজি। তাদের অনুসন্ধানে দেখানো হয়েছে, মিয়ানমারের প্রত্যন্ত কোনো খনি বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেওয়া একটি সিদ্ধান্তও কীভাবে বিশ্ববাজার ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সংঘাতের মূল কারণ নয়, তবে যুদ্ধের জ্বালানি
মিয়ানমারের সংঘাত মূলত ক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতিগত স্বায়ত্তশাসনের লড়াই। খনিজ সম্পদ এই সংঘাতের মূল কারণ নয়। তবে মূল্যবান খনিজের খনি ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনী এবং তাদের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বিপুল অর্থের জোগান দিচ্ছে।
এই অর্থ দিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনা, যোদ্ধাদের সংগঠিত রাখা এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে খনিজ সম্পদ একদিকে আন্তর্জাতিক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করছে, অন্যদিকে মিয়ানমারের যুদ্ধরত পক্ষগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।
টিন: একটি খনির সিদ্ধান্তে নড়ে বিশ্ববাজার
মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চীন সীমান্তবর্তী মান মাও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ টিনের খনিগুলোর একটি। এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ)। ২০ হাজারের বেশি সদস্যের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী কার্যত স্বশাসিত একটি অঞ্চল পরিচালনা করে। ১৯৮৯ সাল থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিরতি রয়েছে।
২০১০-এর দশকের শেষ থেকে ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে মিয়ানমার বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম টিন উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়। চীন ও ইন্দোনেশিয়ার পর ছিল দেশটির অবস্থান। আর মিয়ানমারের টিনের বড় অংশই আসত মান মাও থেকে।
উৎপাদনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চীনের আমদানি করা টিন আকরিকের ৯০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করত মিয়ানমার। উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, ২০১০-এর দশকে মান মাওয়ে খনি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। যেখানে আগে ছিল বন, সেখানে গড়ে ওঠে সড়ক, আকরিক মজুতের জায়গা, খনিবর্জ্যের স্তূপ এবং শ্রমিকদের আবাসন।
সর্বোচ্চ উৎপাদনের বছরগুলোতে মিয়ানমার থেকে চীনে টিনের ঘন আকরিক রপ্তানির মূল্য বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি ছিল।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সম্পদ নিরীক্ষার কথা বলে মান মাওয়ে খনন বন্ধের ঘোষণা দেয় ওয়া কর্তৃপক্ষ। ওই বছরের আগস্টে উৎপাদন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর পরপরই লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে টিনের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। চীনের ধাতু গলানোর কারখানাগুলোও বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে শুরু করে।
তবে খনি বন্ধের পেছনে শুধু সম্পদ নিরীক্ষার বিষয়টি ছিল না বলে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে আইসিজি। খনি পরিচালনাকারী সাতটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, ওয়া নেতৃত্বে প্রজন্মের পরিবর্তন এবং খনির রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধও এতে ভূমিকা রেখেছিল।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে খনি খননের অনুমতির আবেদন নেওয়া শুরু হয়। জুলাইয়ে প্রথম অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর চীনে আকরিক পাঠানো আবার শুরু হয়।
চলতি বছরের জুনে চীনের আমদানি করা টিন আকরিকের ৩৭ শতাংশ আসে মিয়ানমার থেকে। অর্থাৎ দেশটি আবার চীনের সবচেয়ে বড় একক সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। যদিও উৎপাদন এখনো আগের পর্যায়ে ফেরেনি।
২০২৩ সাল থেকে গভীর ও উন্নত মানের খনিজ থাকা খনিগুলোতে পানি জমে আছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১১টি খনিপথ থেকে পানি সরানোর খরচ ভাগাভাগির নিয়ম করে ওয়া কর্তৃপক্ষ। উপগ্রহচিত্রে নতুন ভবন ও রাতের আলো বাড়তে দেখা গেলেও উৎপাদন এখনো আগের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যভান্ডার বা ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের সঙ্গে টিনের চাহিদাও বাড়ছে। সার্ভার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ যুক্ত করতে ব্যবহৃত ‘সোল্ডারে’ টিন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে টিনের দাম টনপ্রতি ৫৩ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। ফলে উন্নত কম্পিউটার অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ এমন একটি খনির ওপর নির্ভর করছে, যার নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমার রাষ্ট্রের হাতে নেই।
সোনা: প্রতিরোধযুদ্ধের অর্থের উৎস
মিয়ানমারে সরকার ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আয়ের উৎস হিসেবে সোনার খনি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সংঘাত, অর্থনৈতিক পতন এবং বিশ্ববাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির কারণে দেশটির মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় নতুন করে সোনা উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে আইসিজি জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের পর সাগাইং অঞ্চলের কিছু এলাকায় সোনা উত্তোলনের পরিসর ১৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সরকারি হিসাবে মিয়ানমারে বছরে মাত্র ৫০০ কেজি সোনা উৎপাদিত হয়। তবে অনানুষ্ঠানিক উৎপাদন এর অন্তত ১০ গুণ বেশি হতে পারে। সে হিসাবে দেশটির সোনা শিল্পের বার্ষিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার। এই খাতে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাগাইং অঞ্চলের সামরিক সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বলছে, সোনা উত্তোলনের ওপর কর আরোপ তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনার অর্থ জোগানের অল্প কয়েকটি উপায়ের একটি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতা ব্যক্তিগতভাবেও এই ব্যবসা থেকে লাভবান হচ্ছেন। তাঁদের কেউ কেউ নিজেরাই নদীতে সোনা উত্তোলনের নৌযান পরিচালনা করছেন।
সামরিক সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তারাও এই খাত থেকে সুবিধা পাচ্ছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। হামলা না করার বিনিময়ে তাঁরা খনিশ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ এবং অনানুষ্ঠানিক কর আদায় করছেন।
অন্যদিকে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর আয়ের উৎস বন্ধ করতে সোনার খনিতে বিমান হামলাও চালিয়েছে সামরিক বাহিনী। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নয় মাসে অন্তত আটটি শহরাঞ্চলে খনি লক্ষ্য করে কয়েক ডজন হামলা হয়েছে।
সোনা উত্তোলনের জন্য নদীর তলদেশ ও চর খনন করা হচ্ছে। চিন্দুইন নদীতে শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা উর্বর চর খননের পর সেগুলো আর চাষের উপযোগী থাকছে না। খনির কাজ নদীর তীর ছাড়িয়ে বন, ধানখেত ও বসতবাড়ির কাছাকাছিও ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃষকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাঁদের জমি খনি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে চাপ দিচ্ছে।
খনি থেকে উত্তোলিত সোনা নৌকা, সড়ক বা উড়োজাহাজে মান্দালয়ের পরিশোধনাগারে পাঠানো হয়। মিয়ানমারের মুদ্রা কিয়াতের অস্থিতিশীলতা, মূলধন নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদার কারণে দেশের ভেতরেও এর বড় বাজার রয়েছে। তবে ভারত ও বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া যায় বলে সীমান্তপথে সোনা পাচারও করা হয়।
ফলে সোনার খাতটি একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ জোগাচ্ছে; অন্যদিকে কৃষিজমি ধ্বংস, পানি দূষণ, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পদ বৃদ্ধি এবং খনির আশপাশের জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক হামলার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জেড: ‘স্বর্গের পাথর’ ঘিরে নিয়ন্ত্রণের লড়াই
চীনে বহু শতাব্দী ধরে জেডকে ‘স্বর্গের পাথর’ বলা হয়। এটি আভিজাত্য, সুরক্ষা ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মানের জেডের বড় অংশ, বিশেষ করে উজ্জ্বল সবুজ ‘ইম্পেরিয়াল জেড’, আসে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের কাচিন রাজ্যের হপাকান্ত থেকে।
প্রতিবছর হপাকান্তের খনি থেকে শত শত কোটি ডলারের জেড চীনে যায়। এই বাণিজ্য থেকে লাভবান হয় খনি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে খনি, আশপাশের সড়ক এবং সীমান্ত পারাপারের পথ নিয়ন্ত্রণকারী সশস্ত্র পক্ষগুলোও এই অর্থের ভাগ পায়।
১৯৯৪ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশনের (কেআইও) মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর হপাকান্তের খনি এলাকায় বড় পরিবর্তন আসে। ছোট পরিসরের খননের জায়গায় গড়ে ওঠে শিল্পভিত্তিক বিশাল খনি। ১৯৯০ সাল থেকে তোলা উপগ্রহচিত্রে এই রূপান্তর স্পষ্ট।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক লাখ অভিবাসী শ্রমিক হপাকান্তে যান। তাঁদের অনেকে খনির বর্জ্যের মধ্যে মূল্যবান পাথর খুঁজে ভাগ্য বদলের আশায় কাজ করেন। কিন্তু খনি সম্প্রসারণের মানবিক ও পরিবেশগত মূল্যও অনেক বড়।
শ্রমিকদের মধ্যে মাদকাসক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। খনির বর্জ্যের ধসে বারবার বহু শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শিল্পভিত্তিক খননের কারণে পাহাড় কেটে হপাকান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা ধুলোময় ও পরিত্যক্ত ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
চীনের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে ২০০০ ও ২০১০-এর দশকে জেডের চাহিদা ও মুনাফা বাড়ে। তবে সরকারি হিসাবে এই বাণিজ্যের সামান্য অংশই ধরা পড়ে। উন্নত মানের জেড প্রায়ই সরকারি নিলাম এড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক পথে চীনে যায়। পথে কর্মকর্তা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পরিবেশ ও মানবাধিকারবিষয়ক অনুসন্ধানী বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল উইটনেসের হিসাবে, ২০১৪ সালে মিয়ানমারের জেড শিল্পের মূল্য সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার হতে পারে। এটি ছিল দেশটির তৎকালীন সরকারি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক।
২০১২ সালের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলে প্রকাশ্যে বিলাসী পণ্য কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর জেডের আয় সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কমলেও শিল্পটি এখনো বছরে শত শত কোটি ডলারের।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কাচিন রাজ্যে সংঘাত বেড়ে যায়। কেআইও সামরিক সরকারের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। সংগঠনটি নতুন গঠিত পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের (পিডিএফ) সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তাও দিয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর প্রথম কয়েক বছর হপাকান্তের জেড খনি সরাসরি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের মার্চে কেআইও বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। তারা চীনের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা, বাণিজ্য ফটক এবং বিরল মৃত্তিকার খনি দখল করে।
এর ফলে কাচিন রাজ্যের কয়েকটি লাভজনক ও কৌশলগত এলাকার নিয়ন্ত্রণ বদলে যায়। একই সঙ্গে হপাকান্তের খনি এবং সেখানকার বিপুল আয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন করে লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়।
বিরল মৃত্তিকা: সবুজ জ্বালানি ও সমরাস্ত্রের একই উৎস
বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন এবং উন্নত অস্ত্রে ব্যবহৃত শক্তিশালী চুম্বক তৈরিতে ভারী বিরল মৃত্তিকা প্রয়োজন। এসব উপাদানের মধ্যে মিয়ানমার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের জন্য।
বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন এবং আধুনিক অস্ত্রের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতার চুম্বকের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এসব খনিজ। উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদনেও এগুলোর ব্যবহার রয়েছে।
বিরল মৃত্তিকার বাজারে চীনের প্রাধান্য রয়েছে। তবে পরিবেশবিধি কঠোর করার পর ২০১০-এর দশকের শুরু থেকে দেশটি নিজ ভূখণ্ডে ভারী বিরল মৃত্তিকা উত্তোলন কমাতে থাকে। ২০১৬ সালে চীনের এই খনিজ উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র চিয়াংসি প্রদেশের অনেক খনি বন্ধ করে দেওয়া হয়। দক্ষিণের ইউনানসহ অন্যান্য প্রদেশের ছোট খনিতেও উৎপাদন কমে যায়।
এরপর খনিজ উত্তোলনের কাজ সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে সরে যায়। সেখানে খনি এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পরিবেশ সুরক্ষার খুব কম ব্যবস্থা নিয়েই খনন চালানোর অনুমতি দেয়।
২০১৪ সালে মিয়ানমার থেকে চীনে বিরল মৃত্তিকা রপ্তানির মূল্য ছিল প্রায় ১৫ লাখ ডলার। ২০২১ সালে তা বেড়ে প্রায় ৭৮ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ওই বছর মিয়ানমার চীনের ভারী বিরল মৃত্তিকার কাঁচামালের সবচেয়ে বড় একক উৎসে পরিণত হয়।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধ বিস্তৃত হলে খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণেও পরিবর্তন আসে। আগে প্রধান খনি এলাকা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অনুগত সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের শেষ দিকে কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন ওই এলাকা দখল করে। এরপর খনির রাজস্ব সামরিক সরকার ও তার সহযোগীদের পরিবর্তে কেআইওর হাতে যেতে শুরু করে।
কেআইও খনির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর চীন কিছুদিনের জন্য সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। বিরল মৃত্তিকা আমদানির পাশাপাশি খনিতে ব্যবহৃত উপকরণ রপ্তানিও বন্ধ রাখে দেশটি। তবে সরবরাহের গুরুত্বের কারণে পরে সীমিত বাণিজ্য চালু হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে বাণিজ্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়।
বিরল মৃত্তিকার নিয়ন্ত্রণ কেআইওকে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির শক্তি দিয়েছে। সীমান্তের অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে চীন যে মাত্রায় চাপ দিয়েছে, কেআইওর ক্ষেত্রে তেমনটি করেনি। আইসিজির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কৌশলগত এই খনিজের সরবরাহকারী হিসেবে কেআইওর গুরুত্ব এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
তবে এই সম্পদ কেআইওর জন্য একই সঙ্গে শক্তি ও দুর্বলতার উৎস। বিরল মৃত্তিকার সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন চীন মেনে নেবে না। ফলে খনির নিয়ন্ত্রণ কেআইওকে যেমন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিচ্ছে, তেমনি বেইজিংয়ের চাপের মুখেও ফেলতে পারে।
উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, কাচিন রাজ্যে বিরল মৃত্তিকার খননের এলাকা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় শান রাজ্যে তুলনামূলক ছোট একটি খনি এলাকা মাত্র এক বছরে তিন গুণ হয়েছে।
এই খনিজ উত্তোলনের জন্য পাহাড়ের ভেতর বিষাক্ত রাসায়নিক ঢোকানো হয়। পরে খনিজমিশ্রিত তরল পাহাড়ের নিচে তৈরি পুকুরে জমা করা হয়। উপগ্রহচিত্রে পাহাড়ের গাছপালা পরিষ্কার করে ফেলা, রাসায়নিক তরল রাখার পুকুর এবং বর্জ্য এলাকার দ্রুত সম্প্রসারণ দেখা গেছে। অনেক খনি গড়ে উঠেছে নদী ও জলাধারের কাছাকাছি।
পূর্ব শান রাজ্যের খনির দূষণ মেকং নদীর উপনদীতেও ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমার থেকে প্রবাহিত নদীগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী আর্সেনিক দূষণের তথ্য পেয়েছে থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ। আঞ্চলিক পর্যবেক্ষণেও থাইল্যান্ড ও লাওসে দূষণ পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
দূষণ মিয়ানমারে, নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে
মিয়ানমারের খনিজ সম্পদের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি হলো—চীন নিজের ভূখণ্ডে দূষণকারী খনি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে, অথচ খনিজ উত্তোলনের সবচেয়ে ক্ষতিকর অংশের বড় একটি অংশ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে চলে গেছে।
ফলে পরিবেশগত ক্ষতির বড় বোঝা বহন করছে মিয়ানমার। অন্যদিকে খনিজ পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চূড়ান্ত পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে চীন।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে যাওয়া জরুরি। কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এখন মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আসছে। এসব খনিজ উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে এবং সেই দূষণ সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পৌঁছাচ্ছে।
একই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে এখন সমরাস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তির চাহিদাও যুক্ত হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বায়ুবিদ্যুতের টারবাইনের পাশাপাশি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর কাঁচামালও আসছে মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে।
ফলে মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ এখন শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি স্থানীয় যুদ্ধ, চীনের শিল্পব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একই সরবরাহশৃঙ্খলে যুক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজের চাহিদা খনি সম্প্রসারণে উৎসাহ দিচ্ছে। আর সেই খনি থেকে পাওয়া অর্থ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও তাদের সশস্ত্র বিরোধীদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য জোগাচ্ছে।
অর্থাৎ, মিয়ানমারের পাহাড়, নদী ও সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত খনি থেকে উত্তোলিত সম্পদের প্রভাব এখন আর দেশটির ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। ‘স্বর্গের পাথর’ জেড থেকে শুরু করে টিন, সোনা ও বিরল মৃত্তিকা—এই খনিজগুলো একই সঙ্গে বৈশ্বিক শিল্পের কাঁচামাল, যুদ্ধের অর্থের উৎস এবং একটি গভীর পরিবেশগত সংকটের অংশ হয়ে উঠেছে।