ঢাকা

ইরান যুদ্ধের অভিঘাত নিয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা, ‘ভূমিকম্পের মতো’ প্রভাব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আল–জাজিরা

নিউইয়র্ক

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই বদলে দেয়নি, এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, নৌপথ, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও। এই প্রভাবকে ‘ভূমিকম্পের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল থানি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে রয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। রোববার কাতার ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি উত্তেজনার মূল কারণগুলো মোকাবিলা করতে হবে।

শেখ মোহাম্মদের বক্তব্যে একই সঙ্গে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের প্রভাব এবং কাতারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। তাঁর মতে, নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশকে স্থায়ী করে কোনো রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

‘ভূমিকম্পের মতো’ অর্থনৈতিক অভিঘাত

কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে একটি ‘ভূমিকম্পের’ সঙ্গে তুলনা করা যায়। এর ‘কম্পন’ মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূরে পৌঁছে গেছে। তাঁর মতে, এই অভিঘাত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে এত দিন প্রচলিত ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

তিনি বলেন, সংকটের সময়ে প্রায় প্রতিটি আলোচনাই শুরু হয়েছে নিরাপত্তা ও উত্তেজনা প্রশমনের প্রশ্ন দিয়ে। পরে সেই আলোচনা গড়িয়েছে জ্বালানি সরবরাহ, নৌপথ এবং বিনিয়োগের মতো অর্থনৈতিক বিষয়েও।

শেখ মোহাম্মদের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো—মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটকে তিনি কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনায়।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন এসব খাত একসঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে, তখন কোন বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করা যায়?

নিরাপত্তার জন্য নতুন আঞ্চলিক কাঠামোর প্রস্তাব

কাতারের প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এমন একটি কাঠামো দরকার যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো হবে এবং কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারবে না।

শেখ মোহাম্মদের ভাষায়, ‘কোনো রাষ্ট্রকে যদি চিরস্থায়ীভাবে অনিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়, তাহলে কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমেই সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।’

তাঁর মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু সংঘাতের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। উত্তেজনার উৎসগুলো শনাক্ত করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করতে হবে।

যুদ্ধের প্রভাব কাতারেও

কাতার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও উচ্চ আয়ের উপসাগরীয় অর্থনীতি হলেও চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব থেকে দেশটি পুরোপুরি মুক্ত নয়—এ কথাও স্বীকার করেছেন শেখ মোহাম্মদ।

তিনি বলেন, সংকটময় সময়ে কাতারের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ‘ভিত’ নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, দেশটি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আঞ্চলিক সংঘাতের কোনো প্রভাব কাতারের ওপর পড়ছে না।

জ্বালানি, সমুদ্রপথ, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য—এসব খাতের পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কাতারের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির অর্থনীতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সমুদ্রপথের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

৩৮ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিকল্পনা

আঞ্চলিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও কাতার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশটির অবকাঠামো খাতে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ।

এই বিনিয়োগের লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; এর মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা এবং কাতারের অর্থনীতি আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিস্থাপক—এমন বার্তা দেওয়াও উদ্দেশ্য বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, একদিকে কাতার আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিকে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

উত্তেজনা বাড়ানোর ‘চক্র’ থেকে বের হওয়ার আহ্বান

শেখ মোহাম্মদের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল উত্তেজনা বাড়ানোর ধারাবাহিকতা বন্ধ করা।

তাঁর মতে, একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাহীনতা যদি অন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে এভাবে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে নিরাপত্তাকে এমন একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে দেখার আহ্বান রয়েছে, যেখানে কোনো রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে হুমকির মধ্যে রাখা হবে না।

কাতারের এই অবস্থান দেশটির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ভূমিকার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের পথ যখন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তখন দোহা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।

তেহরান–ওয়াশিংটন আলোচনা ফেরানোর চেষ্টা

আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু করার জন্যও কাতার কাজ করছে।

রোববার নিউইয়র্কে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে কাতারের মধ্যস্থতা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারীরা দুই রাজধানীর মধ্যে যোগাযোগ করছেন এবং মতপার্থক্য কমাতে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে।

এর আগে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইও আল–জাজিরাকে জানিয়েছিলেন, কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের যুদ্ধ অবসানের শর্ত পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে যুদ্ধের সব ফ্রন্টে অবসান, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি রয়েছে।

ফলে কাতারের বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ আলোচনা নয়; ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

হরমুজের গুরুত্ব

এই পুরো সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ এটি।

সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আল–জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল আগের তুলনায় কমেছে। সপ্তাহান্তে মাত্র ১২টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যেখানে তার আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল ৩৫।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে। আর সেখান থেকেই কাতারের প্রধানমন্ত্রী যে ‘ভূমিকম্পের’ উপমা দিয়েছেন, তার অর্থনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মধ্যপ্রাচ্য বড় ইস্যু

সোমবার থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ সপ্তাহে বিশ্বনেতাদের বক্তব্য ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রীও এই কূটনৈতিক পরিসরকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রশ্নে কাতারের অবস্থান জাতিসংঘের অধিবেশনের আলোচনায়ও গুরুত্ব পেতে পারে।

এদিকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য কর্মকর্তার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—দোহা শুধু চলমান সংঘাতের তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও আলোচনা সামনে আনতে চাইছে।

কাতারের বার্তা কী

শেখ মোহাম্মদের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটকে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, জ্বালানি সরবরাহ, নৌপথ, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করতে হবে।

কাতার একদিকে নিজের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার পথ পুনরায় চালুর জন্য মধ্যস্থতা করছে।

তবে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো নিশ্চিত কোনো সমাধানে পৌঁছায়নি। ইরান যেমন আলোচনায় ফেরার শর্ত জানাচ্ছে, তেমনি সামরিক প্রস্তুতির কথাও বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

এই অবস্থায় কাতারের প্রধানমন্ত্রীর ‘ভূমিকম্পের মতো’ অভিঘাতের মন্তব্য মূলত একটি সতর্কবার্তা—মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি সংঘাতকে আর শুধু আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর অভিঘাত নিরাপত্তা ও কূটনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জ্বালানি, বাণিজ্য, নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পৌঁছাতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স